রবিবার, ১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২রা রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

আগস্টে ৫১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪৮১ জন

আগস্টে ৫১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪৮১ জন

ঢাকা: গেলো আগস্ট মাসে সারা দেশে ৫১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮১ জন নিহত ও ৬৬৪ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৬১ জন নারী ও ৫৮টি শিশু রয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের আগস্ট মাসের সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সংগঠনটি থেকে প্রকাশিত এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্টে প্রতিদিন গড়ে ১৫ দশমিক ৫১ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। আগের মাস জুলাইয়ে দৈনিক গড় প্রাণহানি ছিল ১৩ দশমিক ৪১ জন। সে হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

আগস্টে মোট ১৮৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৭৬ জন। এছাড়া পথচারী নিহত হয়েছেন ১০২ জন, যা মোট নিহতের ২১ দশমিক ২০ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৬৭ জন, অর্থাৎ মোট প্রাণহানির ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ।

যানবাহনভিত্তিক হিসাবে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৭৬ জন, বাসের যাত্রী ৩৭ জন, ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রাক্টর-লরি ও অন্যান্য ভারী যানবাহনের আরোহী ৫১ জন নিহত হয়েছেন।

এ ছাড়া থ্রি-হুইলার বা অটোরিকশা, অটোভ্যান, ইজিবাইক, সিএনজি ও লেগুনার যাত্রী নিহত হয়েছেন ৭৮ জন। স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী নিহত হয়েছেন ২১ জন। মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও জিপের আরোহী ১১ জন এবং রিকশা ও বাইসাইকেল আরোহী পাঁচজন নিহত হয়েছেন।

সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগস্টে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। এ ধরনের সড়কে ২১৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৪২ দশমিক ৩০ শতাংশ। জাতীয় মহাসড়কে ঘটেছে ১৬৩টি দুর্ঘটনা, অর্থাৎ ৩১ দশমিক ৭৭ শতাংশ। গ্রামীণ সড়কে ৬২টি এবং শহরের সড়কে ৭১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।

১৯৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। এসব দুর্ঘটনা মোট দুর্ঘটনার ৩৮ শতাংশ। মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে ১২৬টি, যা ২৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ। পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা ১০৬টি, পেছন থেকে যানবাহনে আঘাতের ঘটনা ৭৮টি এবং অন্যান্য কারণে আটটি দুর্ঘটনা ঘটেছে।

আগস্টে সংঘটিত দুর্ঘটনাগুলোতে মোট ৭৪৯টি যানবাহন সম্পৃক্ত ছিল। এর মধ্যে ১৯৪টি মোটরসাইকেল, ১০৮টি ট্রাক ও ১০৩টি বাস রয়েছে। এ ছাড়া ১১২টি থ্রি-হুইলার, ৩৬টি কাভার্ডভ্যান, ৩২টি পিকআপ, ২০টি প্রাইভেটকার, ১৪টি মাইক্রোবাস, আটটি অ্যাম্বুলেন্স, চারটি জিপ, ৩৬টি স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন, আটটি রিকশা, পাঁচটি বাইসাইকেল এবং ৩১টি অজ্ঞাত যানবাহন দুর্ঘটনায় যুক্ত ছিল।

সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আগস্টে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে সকালে। এ সময় সংঘটিত হয়েছে মোট দুর্ঘটনার ২৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এ ছাড়া দুপুরে ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ, রাতে ২০ দশমিক ৭ শতাংশ, বিকেলে ১৫ দশমিক ২০ শতাংশ, সন্ধ্যায় ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং ভোরে ৮ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। আগস্টে এ বিভাগে ১৭২টি দুর্ঘটনায় ১৪৪ জন নিহত হয়েছেন। মোট দুর্ঘটনার ৩৩ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং মোট প্রাণহানির ২৯ দশমিক ৯৩ শতাংশই ঢাকা বিভাগের।

রাজশাহী বিভাগে ১৪ দশমিক ৮১ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ১৮ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রাণহানি, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ১৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ প্রাণহানি ঘটেছে।

খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ ও প্রাণহানি ৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ, বরিশালে দুর্ঘটনা ২ দশমিক ৯২ শতাংশ ও প্রাণহানি ২ দশমিক ৯১ শতাংশ, সিলেটে দুর্ঘটনা ৫ দশমিক ৬ শতাংশ ও প্রাণহানি ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ, রংপুরে দুর্ঘটনা ১০ দশমিক ৫২ শতাংশ ও প্রাণহানি ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং ময়মনসিংহে দুর্ঘটনা ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ ও প্রাণহানি ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ।

জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ৩৭ জন নিহত হয়েছেন বগুড়া জেলায়। আর বিভাগ হিসেবে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে বরিশালে—১৫টি। সেখানে নিহত হয়েছেন ১৪ জন। রাজধানী ঢাকায় আগস্টে ৪৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত ও ৫৪ জন আহত হয়েছেন।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, আগস্টে সড়ক দুর্ঘটনায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৬১ জন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, ২৭ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ২৪ জন স্থানীয় ব্যবসায়ী, ২১ জন ওষুধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর বিক্রয় প্রতিনিধি এবং ১৯ জন এনজিও কর্মী ছিলেন।

এ ছাড়া ১৩ জন দিনমজুর, ১২ জন ব্যাংক-বীমা কর্মকর্তা ও কর্মচারী, ১১ জন শিক্ষক, সাতজন পোশাকশ্রমিক, চারজন সাংবাদিক, তিনজন চিকিৎসক, দুইজন প্রকৌশলী, দুইজন সেনাসদস্য, তিনজন বিমানবাহিনীর সদস্য এবং একজন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। আরও চারজন মসজিদের ইমাম বা খাদেম, তিনজন মোটর মেকানিক ও চারজন কৃষিশ্রমিকও দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে যানবাহনের অতিরিক্ত গতি ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ কারণে প্রযুক্তির মাধ্যমে যানবাহনের গতি নজরদারি এবং চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিয়েছে সংগঠনটি।

সংগঠনটির মতে, যানবাহনের বেপরোয়া গতি ও পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহতের ঘটনাও বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জীবন রক্ষায় সচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও অসুস্থতা, অনির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যান চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন না মানা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকে চিহ্নিত করেছে।

সড়ক নিরাপত্তা বাড়াতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন করে এর অধীনে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে পরিচালনার সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

এ ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানে কাঠামোগত সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত এবং কারিগরি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের নিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সংগঠনটি মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং রাজধানীতে রুট পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাসসেবা চালুর সুপারিশ করেছে।

পাশাপাশি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের বাসের সংখ্যা ও সেবা বাড়ানো, দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ জোরদার, চালকদের যথাযথ বেতন-কর্মঘণ্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত এবং স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণের কথা বলা হয়েছে।

সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ, সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা ও দক্ষতা বাড়াতে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ রাখা এবং প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনকে সমন্বিত করে একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সময়োপযোগী নীতিমালা, প্রযুক্তির ব্যবহার, অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংগঠনটি জানিয়েছে, ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে আগস্ট মাসের এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

জেপি/এএস

শেয়ার করুন

এখনই

আরো পড়ুন