রবিবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১২ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১৬ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

মেহেরপুরে বেড়েই চলেছে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ

মেহেরপুরে বেড়েই চলেছে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ

মেহেরপুরে বেড়েই চলেছে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ। অসুস্থ পশুর মাংস স্পর্শের পর হাতে জ্বালাপোড়া, ফোসকা ও ক্ষত সৃষ্টি হয়ে অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন। চলতি বছরে গাংনী উপজেলায় ৪১২জন আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। আক্রান্তদের সবাই গাংনি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা।

উপজেলার বাউট, দেবিপুর, সাহার বাটি, তিরাইল, দুর্লভপুর, সাহেবপুর, কাজীপুর, বামুন্দি, ছাতিয়ান ও রায়পুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাকটেরিয়াজনিত এই রোগ। এ অবস্থায় আক্রান্তদের দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

উপজেলার বাউট গ্রামের রবিউল ইসলাম ১৫দিন আগে একটি ছাগল জবাই করেন। মাংস নাড়াচাড়া করার পরপরই তার হাতের কবজিতে শুরু হয় জ্বালাপোড়া। পরদিন কবজিতে ফোসকা পড়ে যায়। হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে জানতে পারেন তিনি অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন।

দেবিপুর গ্রামের আবুল কালামের মেয়ে সাথি খাতুন (২৫) গত ১৮ আগস্ট ফ্রিজ থেকে মাংস বের করে রান্না করেন। মাংস নাড়াচাড়ার পরপরই তার দুই হাতে শুরু হয় জ্বালাপোড়া। পরদিন হাতে ফোসকা পড়ে যায়। পরে হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারেন, তিনিও অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন।

সাথি খাতুনের মতো গাংনী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের অনেক মানুষ অসুস্থ গবাদিপশুর মাংস জবাই, কাটা, পরিষ্কার ও রান্নার প্রস্তুতির সময় সংস্পর্শে এসে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হচ্ছেন। আক্রান্তদের অনেকেই স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আবার কারও অবস্থা জটিল হলে যেতে হচ্ছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

উপজেলার শাহনাজ খাতুন জানান, তার স্বামী বাজার থেকে গরুর মাংস কিনে বাড়িতে আনেন। রান্নার জন্য মাংস প্রস্তুত করার সময় তার দুই হাতের আঙুলে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। পরে ফোসকা পড়ে ক্ষত তৈরি হয়। চিকিৎসকের কাছে গিয়ে জানতে পারেন, তিনি অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন।

বাউট গ্রামের পলি খাতুনও একইভাবে আক্রান্ত হন। অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে গেলে পরীক্ষায় তার শরীরে রোগটি শনাক্ত হয়। পরে তাকে প্রায় ২০ দিন চিকিৎসা নিতে হয়।

ভোমরদহ গ্রামের বাসিন্দা নাজমুল হোসেন বাজার থেকে গরুর মাংস কিনে বাড়িতে নিয়ে এসে নাড়াচাড়া করার পর তার শরীরে প্রথমে ক্ষত সৃষ্টি হয়। পরে পরীক্ষা করে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়। একই উপজেলার গাড়াডোব গ্রামের সাদিকুর বাজার থেকে কেনা গরুর মাংস নাড়াচাড়া করার পর অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হন।

গাংনী উপজেলার তহবাজারের মাংস বিক্রেতা জবান মণ্ডল জানান, গরু বা ছাগলের মাংস কাটার সময় বেশিরভাগ ব্যবসায়ী খালি হাতে কাজ করেন। এভাবে কাজ করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অসুস্থ পশু জবাই এবং সেই পশুর মাংস বাজারে বিক্রি বন্ধে কার্যকর নজরদারি না থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে। একই সঙ্গে গবাদিপশুর পর্যাপ্ত টিকা না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে মেহেরপুর জেলায় ৪১২জন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের সবাই গাংনী উপজেলার বাসিন্দা।

চিকিৎসকদের মতে, অ্যানথ্রাক্স মূলত ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস নামের ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। আক্রান্ত গরু, ছাগল, মহিষ বা ভেড়ার শরীর থেকে মানুষের মধ্যে জীবাণু ছড়াতে পারে। বিশেষ করে আক্রান্ত পশুর চামড়া, রক্ত, মাংস বা অন্যান্য টিস্যুর সংস্পর্শে এলে মানুষের শরীরে সংক্রমণ হতে পারে। মাটিতেও এ জীবাণুর স্পোর দীর্ঘদিন থাকতে পারে।

গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মাসুদুর রহমান জানান, শরীরে কোনো ক্ষত, ঘা বা চামড়ার সমস্যা থাকলে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু সেই ক্ষত দিয়ে দ্রুত শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তবে মাংস ভালোভাবে রান্না করলে জীবাণুর কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়।

তিনি বলেন, গবাদিপশুর মাংস নাড়াচাড়া করার সময় অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সম্ভব হলে হাতে গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে। মাংস ধরার পর ভালোভাবে হাত পরিষ্কার করতে হবে। শরীরে ফোসকা, কালচে ক্ষত, জ্বালাপোড়া বা অস্বাভাবিক কোনো ক্ষত দেখা দিলে গিয়ে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

শুধু মানুষের চিকিৎসা নয়, অ্যানথ্রাক্স নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গবাদিপশুর রোগ প্রতিরোধ। এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত টিকা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, পর্যাপ্ত টিকা ও জনবল সংকটে রোগটি নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হচ্ছে।

গবাদিপশুকে শতভাগ টিকাদানের আওতায় আনা গেলে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করেন গাংনী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আরিফুল ইসলাম।

তিনি জানান, উপজেলা পর্যায়ে ৩০ হাজার অ্যানথ্রাক্সের টিকা এসেছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার গবাদিপশুকে টিকা দেয়া হয়েছে। তবে লোকবল সংকট ও পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ না থাকায় সব গবাদিপশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান এই চিকিৎসক।

তার মতে, পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ ও নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে রোগটির বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
মেহেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. একেএম আবু সাঈদ জানান, অ্যানথ্রাক্স চামড়ায় দেখা দিলেও ফুসফুস ও খাদ্যনালী আক্রান্ত হলে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। তাই সামাজিক সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কোনো গবাদিপশু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে বা অস্বাভাবিকভাবে মারা গেলে সেটি জবাই করে মাংস খাওয়া কিংবা বিক্রি করা উচিত নয়।

এমজি/এএস

শেয়ার করুন

এখনই

আরো পড়ুন