, || ||

কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছাদ যেন এক টুকরো নির্মল সবুজ উদ্যান

কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছাদ যেন এক টুকরো নির্মল সবুজ উদ্যান

কক্সবাজার : কংক্রিটের শহরগুলো যখন প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে ফেলছে তাদের সবুজ, ঠিক তখনই কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ছাদে জন্ম নিয়েছে এক ব্যতিক্রমী গল্প। এটি কেবল একটি ছাদ বাগান নয়-এটি একজন প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, পরিশ্রম, ভালোবাসা এবং পরিবেশের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার এক জীবন্ত প্রতীক।

যতদূর জানা যায়, এই অসাধারণ সবুজ বাগানের রূপকার “এমএ মনজুর”। নিজের অর্থ, শ্রম ও সীমাহীন মমতা দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এই সবুজ আশ্রয়। শুধু অফিসের ছাদেই নয়, নিজের ভাড়াবাসার ছাদে, কক্সবাজারের বিভিন্ন সড়ক, রোড ডিভাইডার এবং আশপাশের এলাকায়ও তিনি নিরলসভাবে গাছ লাগিয়ে চলেছেন। কোনো প্রচারের আলো নয়, কোনো ব্যক্তিগত লাভ নয়—শুধু প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন এক নীরব সবুজ আন্দোলন।

বর্ষার বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে গাছ লাগানো মানুষটিকে হয়তো অনেকেই একসময় “অদ্ভুত” ভেবেছেন। কেউ হয়তো হাসাহাসি করেছেন, কেউ গুরুত্ব দেননি। কিন্তু সময়ই প্রমাণ করেছে-তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা একজন স্বপ্নবাজ মানুষ। এমন মানুষরাই ভবিষ্যৎকে আগলে রাখেন, এমন মানুষরাই নিঃশব্দে বদলে দেন একটি শহরের মানচিত্র।

আজ সেই ছাদ বাগানে গেলে চোখে পড়ে এক অন্যরকম পৃথিবী। সেখানে আছে অসংখ্য ফুল, ফল, ঔষধি ও ছায়াদানকারী গাছ। আছে পাখিদের কলতান, প্রজাপতির ডানা মেলা, ছোট ছোট প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়। শহরের ব্যস্ততা আর ধুলোমাখা পরিবেশের মাঝখানে এই বাগান যেন এক টুকরো প্রাণের স্বর্গ। এটি শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; এটি জীববৈচিত্র্য রক্ষার এক অনন্য উদাহরণ।

পরিবেশবিদরা বলছেন, নগর এলাকায় ছাদ বাগান শুধু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে না, এটি তাপমাত্রা কমাতে, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে এবং মানসিক প্রশান্তি তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই দিক থেকে মনজুরের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে কক্সবাজারের জন্য এক শিক্ষণীয় ও অনুকরণীয় মডেল।

সবচেয়ে অনুপ্রেরণার বিষয় হলো-এই বাগান দেখতে এসেছেন দেশের খ্যাতিমান কৃষি ও পরিবেশ সাংবাদিক শাইখ সিরাজসহ প্রশাসনের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল ও জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সচিত্র প্রতিবেদন। অর্থাৎ, এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ইতোমধ্যেই পরিবেশ সচেতনতার এক প্রতীক হয়ে উঠেছে।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে শোনা যাচ্ছে, এই ছাদ বাগান উচ্ছেদের আলোচনা চলছে। যদি সত্যিই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে তা হবে শুধু একটি বাগান ধ্বংস করা নয়-একটি স্বপ্ন, একটি সৃজনশীল উদ্যোগ এবং পরিবেশ সচেতনতার প্রতি এক নিরুৎসাহমূলক বার্তা। যে সময়ে পৃথিবী জলবায়ু পরিবর্তন, উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মতো ভয়াবহ সংকট মোকাবিলা করছে, সেই সময়ে এমন একটি উদ্যোগকে ধ্বংস করা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

বরং এই ছাদ বাগানকে আরও পরিচর্যা, সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করা উচিত। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন চাইলে এটিকে “সবুজ নগরায়নের মডেল” হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পাখির আবাসস্থল তৈরির উদ্যোগ, পরিবেশ শিক্ষা কার্যক্রম এবং নগর কৃষি বিষয়ে সচেতনতা তৈরির জন্য এই বাগান হতে পারে একটি বাস্তব শিক্ষাকেন্দ্র।

আজ প্রয়োজন এমন মানুষদের সম্মান জানানো, যারা নিঃস্বার্থভাবে প্রকৃতির জন্য কাজ করেন। কারণ, রাষ্ট্র বা প্রশাসনের একার পক্ষে পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমাজের সচেতন মানুষদের অংশগ্রহণ। এমএ মনজুর সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি নিজের সামর্থ্য দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন-ইচ্ছা থাকলে একজন মানুষও একটি শহরকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে।

কক্সবাজার শুধু বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর নয়, এটি হতে পারে বাংলাদেশের সবুজ ও পরিবেশবান্ধব নগরায়নেরও একটি অনন্য উদাহরণ। আর সেই পথচলায় এমএ মনজুরের ছাদ বাগান হতে পারে এক অনুকরণীয় মাইলফলক। সবুজ বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে, প্রকৃতি বাঁচলে বাঁচবে কক্সবাজার। আর কক্সবাজার বাঁচলে বাঁচবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্ন।

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন/এনডি/এএস

শেয়ার করুন

এখনই

আরো পড়ুন