সাতক্ষীরা: চিরসবুজ সুন্দরবনের মহাজাগতিক রূপ কেবল উদ্ভিদের কোনো অরণ্য নয়; এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় কোটি মানুষের জীবনের সুরক্ষা প্রাচীর এবং বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে থাকা এক অদৃশ্য আশ্রয়। বিশ্বের সবচেয়ে বিশাল ও বৈচিত্র্যময় এই ম্যানগ্রোভ বনের প্রতিটি নদীর বাঁক আর বালিহাঁসের কলতানে জড়িয়ে আছে জীবনসংগ্রাম, স্বজন হারানোর বেদনা এবং প্রকৃতির বিস্ময়কর টিকে থাকার গল্প।
প্রকৃতির পরম জীবনরক্ষক:
বাংলাদেশ ও ভারতের সীমানা জুড়ে বিস্তৃত এই বন ইউনেস্কো স্বীকৃত এক অনন্য বিশ্ব ঐতিহ্য (World Heritage Site)। সিডর, আয়লা, আম্পান কিংবা সাম্প্রতিক ঘুর্ণিঝড়গুলোতে সুন্দরবন যেভাবে নিজের বুক পেতে দিয়ে লোকালয়কে রক্ষা করেছে, তা এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্য। যে বন আমাদের নিঃশব্দে দেয় অকাতর পাহারা, তার ক্ষতর দীর্ঘশ্বাস কি আমরা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারছি?
রয়েল বেঙ্গল, জীবিকা ও নিরাপত্তার অদৃশ্য আতঙ্ক:
সুন্দরবনের মূল আকর্ষণ ও প্রাণব্যবস্থার অন্যতম প্রতীক এর অধিপতি—রয়েল বেঙ্গল টাইগার। নানাবিধ সংকটের মধ্যেও আশার কথা হলো, সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২৫টিতে (যা ২০১৮ সালে ছিল ১১৪টি এবং ২০১৫ সালে ১০৬টি)।

ইতিবাচক খবরের নেপথ্যে লুকিয়ে আছে টিকে থাকার এক নির্মম ও কঠিন বাস্তবতা:
মৌয়াল, বাওয়ালি ও জেলেদের চরম ঝুঁকি: নোনা জলের সাথে লড়াই করে যারা মধু, গোলপাতা ও মাছ সংগ্রহ করেন, তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপ কাটে বাঘের থাবা আর মৃত্যুর ভীতি নিয়ে। সকালে বনে নামা মানুষটি সন্ধ্যায় পরিবারের কাছে ফিরবেন কিনা—তার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না।
দস্যুতা ও নিরাপত্তার সংকট:
সুন্দরবনকে বলা হয় ‘বিশ্বের দ্বিতীয় ম্যানগ্রোভ রিজিয়ন’—কিন্তু জলদস্যু ও বনদস্যুদের একের পর এক অপহরণ বাণিজ্য এবং অভ্যন্তরীণ আতঙ্কের ঘটনা বনের শান্ত পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলছে। বর্তমানে সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তা ও নজরদারি নিয়ে তাই নতুন করে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
যে ক্ষতগুলো আজও শুকায় না:
প্রকৃতির অসীম সহনশীলতা থাকলেও মানুষের অদূরদর্শিতা ও জলবায়ুর নির্দয় প্রভাবে সুন্দরবন আজ চরম বিপন্ন।
পরিবেশগত দুর্ঘটনা:
২০১৪ সালে শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবি থেকে শুরু করে নৌপথের অনিয়ন্ত্রিত দূষণ নদী ও জলজ প্রাণীর স্থায়ী ক্ষতি করে চলেছে। লবণাক্ততা ও ‘মাথা মরা’ রোগ: সমুদ্রের পানি প্রবেশ করে মিষ্টি পানির সংকট তীব্র হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাবে সুন্দরী গাছে দেখা দিচ্ছে মরণব্যাধি ‘টপ ডাইব্যাক’ বা মাথা মরা রোগ।
অপরিকল্পিত উন্নয়ন:
অনিয়ন্ত্রিত শিপিং রুট, শিল্পবর্জ্য এবং অসচেতন পর্যটনের চাপ এই স্পর্শকাতর বাস্তুতন্ত্রকে ঠেলে দিচ্ছে বিপর্যয়ের দিকে।
দায়বদ্ধতার নতুন শপথ:
সরকার ও বন বিভাগের পক্ষ থেকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল বৃদ্ধি, লোকালয়ে প্লাস্টিক ও অনুপ্রবেশ রোধে বেড়া দেওয়া কিংবা ঝড়ের দিনে প্রাণীদের আশ্রয়ের জন্য ‘মাটি কেল্লা’ তৈরির মতো পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। কিন্তু এই মহাবৃক্ষ ও তার অধিবাসীদের বাঁচাতে কেবল আইন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উপকূলীয় অধিবাসী থেকে শুরু করে সাধারণ সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত সদিচ্ছা। ম্যানগ্রোভ বন আমাদের শেখায় কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও নোনা জলে শক্ত করে শিকড় গেড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা পশ্চিম বন বিভাগের বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন সুন্দরবন বাঁচলে রক্ষা পাবে উপকূল, সমৃদ্ধ হবে জীববৈচিত্র্য, আর সুরক্ষিত থাকবে পরবর্তী প্রজন্মের নিঃশ্বাস নেওয়ার ভবিষ্যৎ। আমাদের একমাত্র অঙ্গীকার হওয়া উচিত এই পরম বন্ধুকে কোনোভাবেই ধ্বংস হতে দেওয়া যাবে না; একে আগলে রাখতে হবে সর্বোচ্চ সক্ষমতা ও ভালোবাসা দিয়ে।
জেএন/এএস



