, || ||

১১ বছরেও সাংবাদিক সায়েম হত্যার বিচার হয়নি

১১ বছরেও সাংবাদিক সায়েম হত্যার বিচার হয়নি

ঢাকা: ২০১৫ সালের ৭ই জুলাই রাতে নিজ বাসভবনে আততায়ীর ছুরিকাঘাতে হত্যার শিকার হন চুয়াডাঙ্গার জীবননগর সাংবাদিক সমতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক আবু সায়েম। দীর্ঘ ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার সাংবাদিক আবু সায়েম হত্যার বিচার হয়নি।

হত্যার এক দশক পেরিয়ে গেলেও কী কারণে ছদ্মবেশী অস্ত্রধারী যুবক সায়েমকে কুপিয়ে হত্যা করল তার উত্তর খুঁজে পায়নি তার স্ত্রী-সন্তান ও পরিজনেরা। রাতের পর রাত বাবাকে খুঁজে বেড়ান ছোট দুই সন্তান রুদ্র-রনক। স্বামীর স্মৃতিকে আখড়ে ধরে নিভৃতিতে বেঁচে আছেন স্ত্রী আফরোজা। আর সন্তান হত্যার বিচারের আশায় নিরবে কেঁদে চোখ ভাষান সায়েমের বৃদ্ধ মা-বাবা।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের ৭ জুলাই সায়েম খুন হওয়ার একদিন পর অর্থাৎ ৯ জুলাই তার স্ত্রী আফরোজা খাতুন বাদি হয়ে রাজীব আহমেদ, সাইফুল ইসলাম শিবলু ও সন্দেহভাজন হিসেবে সামাজুল ইসলামকে আসামি করে জীবন নগর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। তিন আসামি গ্রেফতার হলেও চাঞ্চল্যকর এ হত্যার ক্লু বের করতে পারেনি পুলিশ।

পরবর্তীতে হত্যা মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিতে হস্তান্তর করা হলেও উল্লেখযোগ্য কোনো ফলাফল আসেনি। তবে গ্রেফতার ওই তিন আসামিকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয় সিআইডি। বর্তমানে তিন আসামি জামিনে আছেন।মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন আছে।

এদিকে মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও পিতা হত্যার সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়েছেন আবু সায়েমের দুই শিশু সন্তান আবু জুবায়ের রুদ্র ও আবু জাকারিয়া রনক।

সাংবাদিক আবু সায়েমের জ্যেষ্ঠ পুত্র আবু জুবায়ের রুদ্র বলেন, ২০১৫ সালের ৭ জুলাই রাতে যখন বাবা খুন হন, সেই সময়ে আমাদের দুই ভাইয়ের বয়স ছিল যথাক্রমে মাত্র চার এবং আড়াই বছর। বাবার আদর, স্নেহ এবং ভালোবাসা বুঝে উঠার আগেই একটি পরিকল্পিত খুনের মাধ্যমে আমাদেরকে পিতৃহারা করা হয়। বঞ্চিত করা হয় পিতার আদর, স্নেহ থেকে।

তিনি বলেন, আমাদের নিজ বাড়িতে (পেয়ারাতলা) বাবাকে ছুরিকাঘাত করে খুনি রাজীব সরকার। পরে সে পালিয়ে গেলেও আমাদের জ্যাঠা মেহের আলী মোল্লা (বাবার চাচাতো ভাই) এবং এলাকার সাধারন মানুষ অনেক খোজাখুজি করার পর পার্শ্ববর্তী মনোহরপুর গ্রাম থেকে আটক করে রাজীবকে পুলিশে সোপর্দ করে।

রুদ্র বলেন, খুনি রাজিব সরকার ধরা পড়লেও এই খুনের পেছনের রহস্য কী সেই তথ্য উদঘাটন করতে তদন্তকারী সংস্থাগুলো ব্যর্থ হয়। তাকে রিমান্ডে নিয়েও কার্যকর তথ্য (মাস্টারমাইন্ড সম্পর্কে) কেন বের করা গেলোনা এটা নিয়ে আমাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এবং জনমনেও প্রশ্ন আছে।

তার মতে, এই মামলার তদন্তে হয়তো কোন অদৃশ্য চাপ ছিলো, যার কারনে আমাদের বাবার প্রকৃত খুনি (মাস্টারমাইন্ড) আড়ালেই থেকে যায় এবং খুনের পেছনের রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি। আমরা দুইভাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একটি সুষ্ঠু তদন্ত হলে আমাদের বাবা হত্যার মাস্টারমাইন্ড কে ছিলেন সেটা জানতে পারতাম এবং আমরা ন্যায়বিচার পেতাম।

রুদ্র আরও বলেন, আমাদের বাবা সাংবাদিক আবু সায়েম যেহেতু আপনাদের সহকর্মী ছিলেন, তাই আমাদের বিশ্বাস আমাদের বাবার হত্যা মামলার একটি সুষ্ঠু তদন্তে এবং ন্যায়বিচার পেতে আপনারা আমাদের দুইভাই ও আমাদের পরিবারের পাশে থাকবেন এবং সার্বিক সহযোগিতা করবেন।

সাংবাদিক আবু সায়েমের হত্যাকারী- রাজিব সরকার

প্রয়াত সাংবাদিক আবু সায়েমের ভাতিজা মুছা করিম রিপন জানান, আমার চাচা হত্যার এক দশক পেরিয়ে গেলেও খুনের প্রকৃত কারণ আমি বা আমার পরিবার জানতে পারিনি। এতো দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত বিচারকার্য শেষ হলো না এটা অত্যান্ত দুঃখের ও আমাদের পরিবারের জন্য কষ্টের।

রিপন জানান, তবে আমরা খুনের প্রকৃত রহস্য জানতে চাই। আমাদের একটাই দাবী যে, কেন আমার চাচাকে হত্যা করা হয়েছে। খুনের পেছনের রহস্য কী সেই তথ্য উদঘাটন করতে তদন্তকারী সংস্থাগুলো ব্যর্থ। আমার মনে হয় তদন্তটা আরও ভালো ভাবে করা দরকার।

রিপন আরও জানান, আমি ও আমার পরিবার দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। আমরা ন্যায় বিচার প্রত্যাশা করি। আমরা আশা করি আমার চাচা হত্যার ন্যায় বিচার আমরা পাবো।

দীর্ঘ দিনেও স্বামী হত্যার বিচারকার্য শেষ না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে আফরোজা খাতুন জানান, আমার দুই সন্তান আবু জুবায়ের রুদ্র ও আবু জাকারিয়া রনককে নিয়ে আশার আলোয় বুক বেঁধে আছি। জানিনা কেন আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। কে বা কারা এই হত্যার সাথে জড়িত সেটাও জানতে পারিনি।

আফরোজা খাতুন আরও বলেন, আমার স্বামী হত্যার প্রকৃত বিচার চাই। আমি খুনিদের ফাঁসি চাই। আমার দুই সন্তানকে যে বা জারা পিতৃহারা করেছে তাদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দাবী করছি। একইসাথে এই বিচার যেন দ্রুত শেষ হয় সেই দাবী জানাচ্ছি।

প্রয়াত সায়েমের সহকর্মী ও জীবননগর সাংবাদিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক সাংবাদিক আসিম সাঈদ জানান, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা সত্যিই অত্যন্ত হতাশাজনক। সময়মতো ন্যায়বিচার না পাওয়া ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য একটা মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আসিম সাঈদ আরও বলেন, দুঃখের বিষয় হলো আবু সায়েম হত্যা ঘটনার পেছনে কারা ছিল, তা ১১ বছরেও আমরা জানতে পারিনি। আশা করি প্রকৃত সত্যটা একদিন বের হয়ে আসবে। দৃড় ভাবে বিশ্বাস করি আমাদের ভাই হত্যার সুষ্ঠু বিচার হবে।

গত ১১ বছর ধরে বুকে চাপা কষ্ট, শূন্যতা আর আদরের সন্তানকে ছুঁয়ে না দেখতে পারার কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছেন বয়সের ভারে ন্যুব্জ হওয়া বাবা আবুল খায়ের মোল্লা ও মা আমেনা বেগম। সন্তান হারানোর বেদনা নিয়ে নীরবে শোকে পাথর হয়ে গেছেন তারা। সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে প্রিয় সন্তানের বিচার চেয়েছেন তার কাছে।

রাশেদ প্লাবন/এনডি/এএস

শেয়ার করুন

এখনই

আরো পড়ুন