সাতক্ষীরা: পৃথিবীতে সবচেয়ে ভারী বস্তু সম্ভবত পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ। সেই অসীম বেদনার পাহাড় বুকে চেপে আজও নিভৃতে অশ্রু ফেলছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব গোলাম রাজ্জাক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট—দেশজুড়ে যখন স্বৈরাচার পতনের আনন্দ-উল্লাস, ঠিক সেই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে বুলেটবিদ্ধ হয়ে চিরতরে চোখ বুজেছেন তাঁর মেজো ছেলে, অনূর্ধ্ব-১৬ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক নাসিব হাসান রিয়ান (১৭)।
সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার রতনপুর ইউনিয়নের গড়ুইমহল গ্রামের সন্তান রিয়ান ছিলেন একাধারে অলরাউন্ডার ক্রিকেটার। বিসিআইসি কলেজের একাদশ শ্রেণীর মেধাবী শিক্ষার্থী। ব্যাট-বলের লড়াইয়ে তিনি ছিলেন অনন্য।
নিউজিল্যান্ডের টুর্নামেন্টসহ দেশীয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অল্প বয়সেই অর্জিত আয় দিয়ে কিনেছিলেন একটি নিজের গাড়ি। কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, আন্দোলনের দিন গুলিবিদ্ধ রিয়ানকে তাঁর সেই স্বপ্নের প্রিয় গাড়িতে করেই মুমূর্ষু অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল হাসপাতালে।

এসএসসি-তে জিপিএ-৫ পাওয়া এই তরুণের স্বপ্নে কেবল ক্রিকেটই ছিল না; মনে মনে লালন করতেন বৈমানিক (পাইলট) হওয়ার স্বপ্ন। সুঠাম ও মায়াবী চেহারার কারণে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা কাজী হায়াতের চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পেলেও নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি তিনি।
পরিবার ও স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা যায়, জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকেই দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সচেতন ও উদ্বিগ্ন ছিলেন রিয়ান। বিশেষ করে ১৮ জুলাই আন্দোলনের প্রথম দিকে শহীদ হন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফারহান ফাইয়াজ। বন্ধুর অকালমৃত্যু গভীরভাবে নাড়া দেয় রিয়ানকে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন তিনি। পরিবারের শত বারণ সত্ত্বেও বলতেন—“অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।”
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্ট বিকেলে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে রাজপথে নেমে আসে কোটি জনতা। বিজয়ের আনন্দে যখন চারিদিক মুখরিত, তখনো রাজধানীর ধানমন্ডি-শ্যামলী এলাকায় ছিল চরম উত্তেজনা ও গোলাগুলি। স্পটের তীব্র ঝুঁকি জেনেও বিজয়ের মিছিলে শরিক হতে শ্যামলীর বাসা থেকে বের হন রিয়ান।
রিং রোড এলাকায় পৌঁছাতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আকস্মিক গুলির বৃষ্টিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় তাঁর বুক, মুখ ও কাঁধ।তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
ওই রাতেই শ্যামলী জামে মসজিদে জানাজা শেষে কেরানীগঞ্জের আমবাগিচা কবরস্থানে নানার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় এই উদীয়মান তারকাকে।
সময় গড়িয়ে দুটি বছর কেটে গেলেও রিয়ানের শূন্যতা মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারছে না পরিবার। সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছেন তাঁর মা। রিয়ান বেঁচে থাকতে নিজের হাতে রুটিন মেপে ডায়াবেটিস আক্রান্ত মায়ের ওষুধ ও ইনজেকশন নিশ্চিত করতেন। মায়ের চিকিৎসাসেবার সেই হাতটি আজ আর নেই। মায়ের চোখের জল যেন কিছুতেই থামছে না।
ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে রিয়ানের পিতা গোলাম রাজ্জাক বলেন আমরা কোনো আর্থিক সহায়তা বা অনুদান চাই না। আমার অবুঝ সন্তানের বুকে যারা নির্মমভাবে বুলেট চালিয়েছে, আমরা কেবল তাদের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার চাই। সেই সাথে আমাদের পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।”
উল্লেখ্য, শহীদ নাসিব হাসান রিয়ানের পিতা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন। উক্ত মামলায় ইতিমধ্যে ৫৩ জনের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
বছরের পর বছর কেটে গেলেও ঘাতকদের উপযুক্ত শাস্তি ও বিচার পাওয়ার আশায় প্রহর গুনছে এই শোকসন্তপ্ত পরিবার। রক্তে লেখা জুলাই বিপ্লবের ইতিহাসে রিয়ানের মতো বীরদের আত্মত্যাগ চিরকাল তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
আব্দুল মোমিন/এএস



