শনিবার, ১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৮শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১লা রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

আর্সেনিকে বিপর্যস্ত চুয়াডাঙ্গা, হাজারের বেশি প্রাণ গেলেও স্বাস্থ্য বিভাগের খাতায় রোগী শূন্য

আর্সেনিকে বিপর্যস্ত চুয়াডাঙ্গা, হাজারের বেশি প্রাণ গেলেও স্বাস্থ্য বিভাগের খাতায় রোগী শূন্য

চুয়াডাঙ্গা: আর্সেনিকে বিপর্যস্ত দেশের দক্ষিণ পশ্চিমের জেলা চুয়াডাঙ্গার প্রত্যন্ত এলাকা। গত ৩০ বছরে আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। এ সময়ে প্রাণ গেছে অন্তত এক হাজার মানুষের। বছরের পর বছর ধরে এই দুর্ভোগ চললেও এখনো মেলেনি স্থায়ী কোনো প্রতিকার।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চুয়াডাঙ্গায় আর্সেনিকে আক্রান্ত কোনো রোগী নেই। এমনকি জেলায় আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা শূন্য দেখিয়েই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। তবে মাঠের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।

স্থানীয়রা বলছেন, বেশ কয়েক বছর আগে সরকারিভাবে স্থাপন করা হয় কিছু নলকূপ। এখন তা অকেজো হয়ে পড়ে আছে। সমস্যা সমাধানে নতুন করে নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। বেসরকারিভাবে কিছু গ্রামে পানির ব্যবস্থা করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার দামুড়হুদা উপজেলার গোপীনাথপুর, বড় দুধপাতিলা, সদর উপজেলার ডিহি, কৃষ্ণপুর, বেগমপুরসহ সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ গত ৩০ বছর ধরে আর্সেনিকের তীব্র যন্ত্রণায় কাতর। আর্সেনিকে আক্রান্ত এলাকার মধ্যে উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামের অবস্থা অবর্ণনীয়।

এই গ্রামের প্রতিটি পরিবারই আর্সেনিক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত। গত ২০ বছরে আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে কয়েক শত মানুষের। তার মধ্যে আব্দুল আলিমের পরিবারে ৫ জন, জাহিতন নেছার পরিবারের ৫ জন, সবেদ আলীর পরিবারে ৪ জন ও হালিমা খাতুনের পরিবারের ২ জন মারা গেছেন। অঙ্গহানি হয়েছে অনেকের।

নিকটজন হারিয়ে শোকে পাথর হয়েছে স্বজন, শুকিয়েছে তাদের চোখের পানি। তবুও কাটেনি আর্সেনিকের অভিশাপ। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও নিরুপায় হয়ে সেই বিষই পান করছে সবাই। যুগের পর যুগ আর্সেনিকের এমন প্রকোপে ঘুম ভাঙেনি কারও। এ যেন যুগে যুগে টিকে থাকা মহামারি।

গোপীনাথপুর গ্রামের আনারুল ইসলাম বলেন, আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে গত ৩০ বছর ধরে তীব্র যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আছি। হাতের তালু ও পায়ে তলায় সৃষ্টি হয়েছে ক্ষত। যন্ত্রণা বাড়লে কাজ করতে পারি না। গত ২ বছর আগে আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আমার স্ত্রী আর্জিনা খাতুন। এখন মৃত্যুর প্রহর গুনছি।

একই গ্রামের বাসিন্দা রাজীব হাসান বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকেই সুপেয় পানির সংকটে ভুগছি। আমাদের গ্রামের প্রতিটি বাড়ির টিউবওয়েলেই আর্সেনিক রয়েছে। প্রতিটি টিউবওয়েলের পানিই খাবার অযোগ্য। রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত আয়রন ও মেটাল।

তিনি আরও বলেন, ২০০২ সালে একটি বিদেশী সংস্থা আয়রনমুক্ত পানির ট্যাংক নির্মাণ করে দিলেও এখন তা প্রায় অকেজো। এখান থেকে পানি নিতে নিত্যদিন লড়াই করেন এখানকার বাসিন্দারা। এক ফোঁটা কিন্তু এই পানিই বা কতটুকু নিরাপদ? তা আমরা জানি না। এভাবেই যুগের পর যুগ চলে গেলেও সরকারিভাবে নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ।

এই গ্রামের শতবর্ষী জাহিতন নেছা বলেন, আর্সেনিকযুক্ত অনিরাপদ পানি পানে একে একে মৃত্যু হয়েছে আমার পরিবারের ৫ জনের। এখন বাকী সদস্যদের নিয়ে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা। গ্রামের একটি পুরোনো ট্যাংক থেকে পানি নিতে সকাল সকাল বের হতে হয়। কারণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইন দাঁড়িয়ে পানি নিতে হয়।

বড় দুধপাতিলা গ্রামের বাসিন্দা ছালিমা খাতুন বলেন, এই গ্রামের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ আর্সেনিকে আক্রান্ত। মৃত্যুও হয়েছে কয়েক শত। এই গ্রামের শুধু কার্ডধারী রোগীই রয়েছে ১ হাজার ৪০০। এই গ্রামে এনজিও থেকে একটি ট্যাংক করে দিয়েছে। সেটি আমরা সবাই মিলে চালাই। অনাগত সন্তান নিয়ে আতঙ্কে গর্ভবতী মেয়েরাও।

প্রায় ১ যুগ আগে জেলায় আর্সেনিক নিয়ে কাজ করে বেসরকারি সংস্থা রিসোর নির্বাহী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা যে সময় আর্সেনিক নিয়ে কাজ করেছিলাম তখনই জেলায় ৫০ ভাগ গ্রামের টিউবওয়েলের পানিতেই মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া গেছে। আমরা কিছু গ্রামে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু সরকারিভাবে বৃহৎ উদ্যোগ নিয়ে কাজ করতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে সরকারিভাবে আর্সেনিকের উপর একটি জরিপের রিপোর্ট অনুযায়ী ২৭.৭৩ শতাংশ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। সেই জরিপে জেলায় ৮০ থেকে ১০০ ভাগ আর্সেনিকে আক্রান্ত গ্রামের সংখ্যা ছিল ২৯ টি। ৫০ ভাগ আক্রান্ত গ্রাম ছিল ১৭৫টি। ওই সময় আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মিলেছিল ৬০৫ জন।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০০৩ সালের পর আর কোনো জরিপ হয়নি। বর্তমানে জেলার কিছু এলাকায় ৫০ ভাগ টিউবওয়েলের পানিতেই রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক। প্রকল্প না থাকায় গণহারে টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিক শনাক্তের কাজ বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে প্রকল্প না থাকায় বড় পরিসরে নিরসন করা যাচ্ছে না নিরাপদ পানির সংকট। প্রকল্প চালু হলে সমস্যা কিছুটা সমাধান হবে।

চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদ বলেন, আগে একটি প্রকল্প ছিল। সেসময় প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হতো। বর্তমানে প্রকল্প না থাকায় মাঠ পর্যায়ে আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা যাচ্ছে না। মাত্রাতিরিক্ত আয়রন ও হেভি মেটালযুক্ত পানি পানে রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। হতে পারে হেপাটাইটিস ও কিডনিজনিত নানা রোগ।

তিনি বলেন, গোপীনাথপুর গ্রামের মানুষ আর্সেনিকযুক্ত পানি পানের কারণে তাদের শরীরে আর্সেনিকজনিত বিভিন্ন ধরণের জটিলতা দেখা দিয়েছে। অনেক পরিবার আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করে আর্সেনিকসিস ও ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ধরণের রোগে ভুগে মারা গেছেন। বিষয়টি দুঃখজনক।

তিনি আরও বলেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসন, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট সবার সাথে আলোচনা করে এই এলাকার মানুষের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি আশু জরুরী। যেখানে বিশুদ্ধ পানি রয়েছে সেখান থেকে সরবরাহ করার ব্যবস্থা করলে সবচেয়ে বেশি ভালো হয়। সেই পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সমন্বয় করে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য প্রচেষ্টা করা হবে। আমরা পরিকল্পনা করেছি মেডিকেল ক্যাম্প করে যারা আক্রান্ত তাদের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করবো।

ওএনবি

শেয়ার করুন

এখনই

আরো পড়ুন