ঢাকা: কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে র্যাবের টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ১৭ আসামির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে। এ মামলার ১০ আসামি ঢাকা সেনানিবাসের সাবজেলে রয়েছেন। আরও সাত আসামি পলাতক।
ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) গুম করে রাখার মামলায় ১৩ আসামির মধ্যে তিনজন গ্রেপ্তার রয়েছেন। শেখ হাসিনাসহ মামলার অন্য ১০ আসামি পলাতক। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে বিচার চলছে।
গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে শতাধিক মানুষকে গুম করে হত্যার ঘটনায় তিনটি অভিযোগ এনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এরপর ১৪ জানুয়ারি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

এর মধ্যে শতাধিক গুমের অভিযোগে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মামলার বিচার দ্রুত শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছে প্রসিকিউশন। এ তিন মামলার চলমান সাক্ষ্যগ্রহণে উঠে আসছে গুমের লোমহর্ষক নানা বর্ণনা। ইতোমধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান, সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তা এবং গুমের শিকার ব্যক্তিরা।
জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, আমাকে যে বিষয়টি সবচেয়ে ব্যথিত করত, তা হলো— আমরা সেনাবাহিনী থেকে র্যাবে পেশাদার অফিসার পাঠাচ্ছি, আর তারা পেশাদার খুনি হয়ে ফেরত আসছে। এরপর আমি সিদ্ধান্ত দিই, র্যাব, ডিজিএফআই এবং বিজিবিতে কোনো অফিসার পোস্টিংয়ে যাওয়ার আগে ও পরে আমার সাক্ষাৎকারে আসবেন।
তিনি বলেন, যারা র্যাবে যেতেন, তাদের আমি বলতাম, নরহত্যা মহাপাপ এবং কাউকে হত্যা করলে তার পরিবারের অভিশাপ তোমার পরিবারের ওপর পড়বে। একজনকে হাত-পা বেঁধে হত্যা করা অত্যন্ত কাপুরুষোচিত কাজ। সত্যিকারের সাহস হচ্ছে হাত-পা খুলে তার হাতে একটি অস্ত্র দিয়ে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া।
সাবেক এই সেনা প্রধান বলেন, যারা ফেরত আসতেন, তাদের কাছে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা শুনে আমি সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে র্যাবে থাকা সেনাবাহিনীর সদস্যদের সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে আনার জন্য আবেদন জানাই। তিনি স্বীকার করেন, র্যাব রক্ষীবাহিনীর চেয়েও খারাপ। তিনি কোনো কথা দেননি এবং পরবর্তীতে এ নিয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেননি।
তিনি আরও বলেন, আমি শুনেছি, র্যাব যাদের হত্যা করত, তাদের পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে ইট-পাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দিত। র্যাবের এসব কর্মকাণ্ড দেখে আমি বিভিন্ন ডিভিশন ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করতে থাকি এবং অফিসারদের এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করি। একপর্যায়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সব কমান্ডিং অফিসারকে ঢাকায় এনে জুনিয়র অফিসারদের প্রতি তাদের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করি।
সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার ইমরুল কায়েস তার জবানবন্দিতে বলেন, জিয়াউল আহসান স্যারের সঙ্গে এক বছর তিন-চার মাস রানার হিসেবে থাকার সময় আমি লক্ষ্য করি, তিনি বিভিন্নভাবে আসামিদের গুম করতেন। তিনি র্যাব-১-এর টিএফআই সেল থেকে আসা ব্যক্তিদের বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করতেন। এসব পন্থার মধ্যে ছিল গুলি ও ইনজেকশন। পূর্বে বর্ণিত ঘটনার বাইরে আরও ১০-১২ জন ব্যক্তিকে ইনজেকশন পুশ করে হত্যা করেছেন। এই ইনজেকশন প্রয়োগের কাজ কখনো টিএফআই সেলের ভেতরে, কখনো গাড়িতে সংঘটিত হতো। জবানবন্দির একপর্যায়ে এই সাক্ষী কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তিনি আরও বলেন, আমি র্যাব থেকে চলে যাওয়ার পর আগের মতো স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারিনি। আমি দেশের জন্য শপথ গ্রহণ করেছি, প্রশিক্ষণও নিয়েছি; তবে তা কখনোই দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়। আমি রানার হিসেবে তার সঙ্গে থেকে দেখেছি, তিনি ওই সময়ে ১৫০-২০০ জন মানুষকে বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করেছেন। আমি বিবেকের তাড়নায় এবং সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে জবানবন্দি প্রদান করেছি। আমি ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি। কোনো সৈনিককে যেন কখনো আমার মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়।
গুমের শিকার ডা. আশিক উল আকবর তাকে তুলে নেওয়ার দিনের বর্ণনায় বলেন, ২০১৬ সালের ২৩ মে আমার মামার বাড়ি টঙ্গী, গাজীপুরে থাকা অবস্থায় রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে দরজার বাইরে প্রচণ্ড নক করার শব্দ পাই। দরজা খোলার পর ১০-১২ জন সাদা পোশাকধারীকে দেখতে পাই। তারা আমার নাম জিজ্ঞাসা করে। নাম বলার সঙ্গে সঙ্গে তারা আমার মাথায় একটি পাতলা কালো কাপড় পরিয়ে মারধর করতে করতে আমাকে বাসা থেকে বের করে আনে।
তিনি বলেন, এ সময় আমি একটি কালো মাইক্রোবাস দেখতে পাই। তারা আমাকে মাইক্রোবাসে বসিয়ে চোখ শক্তভাবে বেঁধে জমটুপি পরিয়ে দেয়। আমার দুই পাশে দুজন বসে আমার কোমর শক্ত করে ধরে এবং পেছন থেকে আমাকে ধারাবাহিকভাবে মারতে থাকে।
পরে কাপড় দিয়ে ঘেরা একটি জায়গায় রাখা হয় উল্লেখ করে ডা. আশিক বলেন, সেখানে আমার দুই হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেওয়া হয়। আমার পরনের কাপড়চোপড় খুলে পুরোনো একটি লুঙ্গি পরিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে তিন বেলা খাবার দেওয়া হতো। খাবার খাওয়ার সময় এক হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে দেওয়া হতো এবং চোখের বাঁধন কিছুটা ওপরে তুলে দেওয়া হতো। পেছনে একজন লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। সেখানে যা খাবার দেওয়া হতো, সেটাই খেতে হতো। কেউ খেতে না চাইলে প্রচুর মারধর করত। সে কারণে ভয়ে যা দেওয়া হতো, তা দ্রুত খেতে হতো।
গুম অবস্থায় টয়লেটে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, তিন মিনিটের মধ্যে পায়খানা, প্রস্রাব ও গোসল শেষ করতে হতো। তিন মিনিটের বেশি হলে তারা প্রচুর মারধর করত। তিন মিনিটের মধ্যে কাজ শেষ করে চোখ বেঁধে পেছনে ঘুরে দাঁড়াতে হতো এবং দরজায় নক করতে হতো। তখন তারা দরজা খুলে চোখের বাঁধন পরীক্ষা করত এবং পুনরায় হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে যেখানে রাখা হতো, সেখানে নিয়ে যেত।
ডা. আশিক বলেন, সেখানে থাকা অবস্থায় আমাকে একদিন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে ঢুকিয়ে আমাকে প্রচুর মারধর করে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করতে বলে। আমি অস্বীকার করলে আমাকে আরও মারধর করে। আমার হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে হাতে একটি গামছা বাঁধে। গামছার সঙ্গে একটি হুক লাগিয়ে দিয়ে একটি মেশিনের মাধ্যমে আমাকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ঝুলানোর ফলে আমার ওজন বেশি থাকায় দুই হাতের বগলের নিচের চামড়া ছিঁড়ে যেতে থাকে। তখন পাশ থেকে একজন ফিসফিস করে বলছিল—স্যার, ও অনেক মোটা, মরে যাবে স্যার। তখন আমাকে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নামানো হয় এবং পুনরায় জঙ্গি সংগঠনের সদস্য হিসেবে স্বীকার করতে বলা হয়।
তিনি বলেন, আমি অস্বীকার করলে তারা বলে, তাদের কাছে এর থেকেও অনেক কিছু আছে, যা দিয়ে নির্যাতন করবে। এরপরও অস্বীকার করলে আমার দুই কানের লতিতে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার সময় আমার মনে হয়, আমি মরে যাচ্ছি। তখন মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করি এবং প্রচণ্ড ভয় পাই। এরপর আমি তাদের বলি, তারা যা বলবে, আমি তাই স্বীকার করব।
ডা. আশিক আরও বলেন, ৬০ দিন পর তাকে এবং আরও তিনজনকে র্যাব-১-এর মিডিয়া সেন্টারে এনে হাতের হ্যান্ডকাফ ও চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। আমি দেখতে পাই, একটি ব্যাগ থেকে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, নাট-বল্টু ও বিভিন্ন ধরনের বই বের করে একটি টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখা হয়। আমাদের টেবিলের পেছনে গিয়ে দাঁড়াতে বলা হয়। এরপর আমাদের ছবি তোলা হয়।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা জিয়াউল আহসানের মামলাটি খুব দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ব্যবস্থা নিচ্ছি। আর অল্প কয়েকজন সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়ে আমরা মামলাটি শেষ করব। জিয়ার বিরুদ্ধে প্রায় ২০০টির বেশি গুমের অভিযোগ রয়েছে। মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছি।
তিনি বলেন, আমাদের পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ আমরা দিতে পেরেছি। আরও দুই-একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী আছেন। তাদের সাক্ষ্য নিয়ে আমরা মামলাটি শেষ করে দেব। গুমের জেআইসি ও টিএফআইয়ের যে দুটি বিচার চলছে, একটি ব্যারিস্টার আরমান এবং অন্যটি ব্রিগেডিয়ার আজমীরের মামলা। এই দুটি মামলার বিচারও নিয়মিত চলছে এবং সাক্ষ্যগ্রহণ হচ্ছে।
উল্লেখ্য, জিয়াউল আহসান সর্বশেষ টেলিযোগাযোগ নজরদারির জাতীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্টের মাঝামাঝি তিনি গ্রেপ্তার হন।
আরপি/এএস



