ঢাকা: দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের বীর ছাত্র-জনতা একটি ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিস্ট সরকার দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয় এবং ‘রাহুমুক্ত’ হয় বাংলাদেশ। স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্য দিনটি বিজয়ের দিন এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
৫ আগস্ট (বুধবার) ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বীর ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত এই দিনটিকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে জাতীয়ভাবে উদযাপন করা হচ্ছে।
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদের পতন এবং দেশে জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিএনপিসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দল এবং ভিন্নমতের মানুষ সীমাহীন নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

অসংখ্য মানুষ গুম, খুন, অপহরণ, হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকেও মিথ্যা মামলায় বছরের পর বছর কারাগারে থাকতে হয়েছে।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রকামী মানুষের কণ্ঠ স্তব্ধ করতে পলাতক স্বৈরাচারের নির্দেশে দেশে শত শত গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’ গড়ে তোলা হয়েছিল। সেখানে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর অগণিত মানুষকে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে রাখা হয়। অনেককে চিরতরে গুম করা হয়েছে। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী ও কমিশনার চৌধুরী আলমসহ অনেক নেতাকর্মীর আজও কোনো সন্ধান মেলেনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশনসহ দেশের সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে ফেলা হয়েছিল। সংবিধান উপেক্ষা করে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয় এবং নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা হয়।
দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংস করে দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছিল। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট ও টাকা পাচারকে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত করা হয়েছিল এবং দেশে ব্যক্তিতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তা টেকেনি।
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ-বীর ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক, রিকশাচালক, মুটে-মজুর, পোশাকশ্রমিক, হোটেল-রেস্তোরাঁকর্মী, পরিবহন শ্রমিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, গৃহবধূ, নারী ও শিশুসহ সর্বস্তরের মানুষ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমে এসেছিলেন।
তিনি বলেন, অভ্যুত্থান দমনে মরিয়া ফ্যাসিস্ট সরকার রাজপথে গণতন্ত্রকামী জনগণের বুকে গুলি চালিয়ে পাখির মতো মানুষ হত্যা করেছে। এমনকি জনগণের ওপর হেলিকপ্টার থেকেও গুলি চালানো হয়েছিল। স্বৈরাচারের বেপরোয়া গুলি থেকে মায়ের কোলে থাকা শিশুও রেহাই পায়নি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচারের বন্দুকের সামনে রংপুরের শহীদ আবু সাঈদ, চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিম আকরাম এবং ঢাকার শহীদ মুগ্ধসহ অসংখ্য সাহসী সন্তান গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রেরণায় পরিণত হয়েছিলেন। শুধু জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানেই হাজারো মানুষ শহীদ হয়েছেন।
আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ। শত শত মানুষ হাত-পা ও শরীরের অঙ্গ হারিয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, অনেকেই আজীবনের জন্য দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। তার ভাষায়, ৫ আগস্ট বাংলাদেশে যা ঘটেছে, তা শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের ইতিহাসেও এক নজিরবিহীন ঘটনা।
তিনি বলেন, হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। গণতন্ত্রকামী জনগণের সম্মিলিত আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্টরা গণভবন ছেড়ে পালিয়েছে। জাতীয় সংসদ ছেড়ে কথিত সংসদ সদস্যরা পালিয়েছেন। আদালত ছেড়ে প্রধান বিচারপতি এবং মন্ত্রিসভা ছেড়ে মন্ত্রীরাও পালিয়ে গেছেন। ফ্যাসিবাদের দোসররা আত্মগোপনে চলে গেছে।
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত দেশের স্বাধীনতা অর্জন ও রক্ষা, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতিটি বাঁকে লাখো মানুষ আত্মত্যাগ করেছেন।
তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে সব শহীদকে স্মরণ করেন এবং বলেন, দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা, অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য শহীদরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে জাতিকে ঋণী করে গেছেন। প্রতিটি শহীদ পরিবারের কাছেও বাংলাদেশ ঋণী। এখন শহীদদের প্রতি সেই ঋণ পরিশোধের পালা।
তিনি বলেন, জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক, স্বনির্ভর, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই শহীদদের প্রতি ঋণ পরিশোধের আন্তরিক প্রচেষ্টা বাস্তবায়িত হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, হাজারো শহীদের রক্তে স্নাত রাজপথে যে অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছে, তা যে কোনো মূল্যে রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। গণতন্ত্রে ভিন্নমত থাকবে, তবে সেই ভিন্নমত যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়, সে বিষয়ে গণতন্ত্রের পক্ষের প্রতিটি রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে আর কখনোই স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদের উত্থান হতে দেওয়া হবে না এবং দেশকে কখনোই তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হতে দেওয়া হবে না। এসব মৌলিক প্রশ্নে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় ঐক্য অটুট থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বাণীর শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরও বলেন, ১৯৭১ সাল ছিল স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ, আর ২০২৪ সাল ছিল দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ। ১৯৭১ সালের শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলাদেশ যেমন কখনো ভোলেনি, তেমনি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদেরও বাংলাদেশ কখনো ভুলবে না।
পিএস/এএস



