ঢাকা: জুলাই আন্দোলন চলাকালে একদিকে হুমকি-ধমকি আর অন্যদিকে সাংবাদিকদের ফোন ট্যাপিং। নিজের পরাজয়ের শঙ্কায় ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের পথ বেছে নেয় পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা। আন্দোলনে দমন-পীড়নের খবর প্রচার করায় দেশের তিন চারটি টেলিভিশনের সম্প্রচার সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় সরকার।
এসময় ঐতিহাসিক এক কাজ করেন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বাংলাদেশ প্রতিনিধিরা। জীবন বাজি রেখে উত্তাল জুলাইয়ের খবর সংগ্রহ করে তা প্রচার করতে থাকেন বিশ্ব গণমাধ্যমে। পেশাগত এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আহত হন অনেকে। সব মিলিয়ে ফ্যাসিবাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই উত্তাল জুলাইয়ের তথ্য তুলে ধরেছিলেন তারা।
সেসব সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদক মোক্তাদির রশিদ রোমিও এবং এএফপির বাংলাদেশ অফিসের প্রতিবেদক মুহাম্মদ আলী মাজেদ।

জুলাই আন্দোলনের কথা স্মরণ করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাবেক সাংবাদিক মোক্তাদির রশিদ রোমিও বলেন, তারা ওই সময়ে আমাকে বারবার ফোন করে হুমকি দিচ্ছিল। তারা বলছিল, আপনি কোথায় আছেন? আপনি এখনই আমাদের সদর দপ্তরে আসুন।
এএফপির সাবেক সাংবাদিক মুহাম্মদ আলী মাজেদ জানান, উভয় পক্ষ থেকেই আমরা বিভিন্ন কারণে সাংবাদিকরা টার্গেট হয়েছিলাম। এই আন্দোলনে আমাদের পাঁচ থেকে সাতজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।
আন্দোলনের সময় মোবাইল ফোনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আড়ি পেতেছিল বলে উল্লেখ করে আল জাজিরার সাংবাদিক তানভীর চৌধুরী বলেন, আমার মনে হয়েছে, আমাদের সরঞ্জাম কয়েকবার জ্যাম করা হয়েছে। যখনই আমরা লাইভে যাওয়ার চেষ্টা করেছি তহনই ব্যাঘাত ঘটেছে। একটু আগেও আমরা একই জায়গা থেকে লাইভ করেছি, তখন কোনো সমস্যা ছিল না।
তিনি আরও বলেন, আমাদের যেহেতু অন্য কোনো টিম আসতে পারেনি, কারণ তাদের ভিসা দেয়া হয়নি। তাই যতটা সম্ভব খবর সংগ্রহ ও প্রচারের দায়িত্ব মূলত আমার এবং আমার ভিডিও সাংবাদিকের ওপরই ছিল। তবে সব মিলিয়ে আপনি যে প্রশ্নটি করলেন—আমরা কি হুমকির মুখে ছিলাম? হ্যাঁ, ছিলাম।
ওই সময় আন্দোলনের পুরোটা সময় আতঙ্কঘেরা পরিস্থিতির কথা জানিয়ে বিবিসির সাবেক সংবাদদাতা আকবর হোসেন বলেন, কোথাও কোথাও সাংবাদিকরা চাইলেও টেলিভিশন বা পত্রিকার মালিকদের কারণে তা করতে পারেননি। পরিস্থিতি আগের মতোই রয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, একদল সাংবাদিক ছিল, যারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে খুব দহরম-মহরম ছিল। এখন আরেকটি দল তৈরি হয়েছে, যারা অন্য পক্ষের সঙ্গে দহরম-মহরম।
আন্দোলনের খবরাখবর যেন মানুষ না জানতে পারে, সে জন্য শেখ হাসিনার প্রশাসন ইন্টারনেট বন্ধ করে রেখেছিল উল্লেখ করে রয়টার্সের প্রতিনিধি স্যাম জাহান বলেন, রাস্তাঘাটে যা যা ঘটছিল, আমরা সেগুলো সবই লিপিবদ্ধ করছিলাম। কিন্তু আমাদের কাজ পাঠাতে পারছিলাম না। ইন্টারনেটের খোঁজে আমি ঢাকা শহরের যত পাঁচতারকা হোটেল আছে, সব জায়গায় ঘুরেছি। কিন্তু কারও কাছেই ইন্টারনেট ছিল না।
ইন্টারনেট সেবা পাওয়ার জন্য ওই সময় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের লাইফলাইন হয়ে ওঠে এএফপির ঢাকা ব্যুরো অফিস।
এ প্রসঙ্গে এএফপির সাবেক ব্যুরোপ্রধান শফিকুল আলম বলেন, জুলাইয়ের ১৮ তারিখ থেকে ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। এরপর বাংলাদেশে কোনো সংবাদপত্র বা বিদেশী সংবাদ সংস্থার কাছেই ইন্টারনেট ছিল না। পরে সবাই জানতে পারল, এএফপির কাছে ইন্টারনেট রয়েছে। তখন সবাই আমাদের অফিসে আসতে শুরু করল।
তিনি আরও বলেন, আমরা সবাইকে সুযোগ দিয়েছি। সীমিত সক্ষমতার কারণে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ কিছুটা ভাগ করে দিতে হয়েছে। আমাদের প্রতিটি কম্পিউটার অন্য সাংবাদিকদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলাম। আমরা বলেছি, আপনারা বসে রিপোর্ট করুন।
আরপি/এএস



