সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৬ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১০ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

ভর্তি জালিয়াতির তথ্য ফাঁস না হওয়া ও টাকা আদায় করতেই আজমুলকে হত্যা

ভর্তি জালিয়াতির তথ্য ফাঁস না হওয়া ও টাকা আদায় করতেই আজমুলকে হত্যা

চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার তিতুদহ ইউনিয়নের বড় শলুয়া গ্রামের কুতুব উদ্দীনের ছেলে ও নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেনকে গত শুক্রবার দিবাগত মধ্য রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ইসলামনগর মসজিদগলি এলাকার একটি মেসে নির্মম নির্যাতনের পর ভবনের ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করা হয়।

গণমাধ্যম গুলো শুরুতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খান জাহান আলী হলে গিয়ে চুরি, মেসের টাকা-পয়সা চুরি এবং মেসে মিল না দিয়েই ভাত খাওয়া কারণের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে উল্লেখ করে সংবাদ প্রচার করছিল। এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী, এলাকাবাসী ও ছাত্রদের দেওয়া নানা তথ্য সামনে আসছে। এদিকে আজমুলের ছাদ থেকে নিচে পড়ে যাওয়া নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে।

তবে গতকাল রবিবার আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দীন, আজমুলের খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভুয়া ভর্তি নিয়ে মেস ম্যানেজার মেহেদীর টাকা লেনদেনের ঘটনা সামনে আনেন।

কুতুব উদ্দীন জানান, ২০২৪ সালে এইচএসসি পাস করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিং করতে আজমুল ঢাকায় যায়। পরে খুলনায় এসে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েও কোথাও সুযোগ পায়নি। এরপর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের ওই মেসের ম্যানেজার মেহেদির সাথে তার পরিচয় হয়। সেখানে উঠে পড়ে আজমুল।

আজমুলের বাবা বলেন, মেহেদীর সাথে আজমুলের সু-সম্পর্ক তৈরী হয়। আজমুলকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়ে ৪ বছর পর জাল সার্টিফিকেটের প্রলোভোন দেখায় মেহেদি। আজমুল মেহেদির পাতা ফাঁদে পড়ে চার বছর পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাল সার্টিফিকেটের লোভে এক লাখ ২০ হাজার টাকার চুক্তি করে।

কুতুব উদ্দীনের ভাষ্য, পরবর্তীতে ছেলে আজমুল ফোন করে তাকে জানায়, সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। ছেলের কথা বিশ্বাস করে তিনি ভর্তির টাকা দেন। তবে চুয়াডাঙ্গার একজন সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তার সহায়তায় এক বছর পর হঠাৎ জানতে পারেন, আজমুল আসলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়নি।

তিনি বলেন, অনেক চাপাচাপির পর আজমুলও বিষয়টি স্বীকার করে। এরপর সে বিদেশে চলে যাওয়ার কথা বলে আইইএলটিএস করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। পরবর্তীতে ছেলেকে বুঝিয়ে শুনিয়ে গত ১০ই সেপ্টেম্বর খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করি।

কুতুব উদ্দীন আরও বলেন, আজমুলের নর্থ ওয়েস্টার্নে ভর্তির বিষয়টি মেহেদী জানতে পেরে প্রতারণার টাকা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় পড়ে মেহেদি। আজমুল গত বৃহস্পতিবার বাড়িতে এসেছিল। ওই দিন দুপুর ১২টার দিকে মেহেদী আজমুলকে ফোন করে ৫৮ হাজার টাকা চায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় বাবদ। আজমুল জানায় তার কাছে ২৩ হাজার টাকা আছে। তখন ওই টাকা মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে পাঠিয়ে তাকে দ্রুত খুলনায় ফিরে যেতে বললে, সে খুলনায় ফিরে যায়।

আজমুলের বাবা দাবি করেন, ভর্তি জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। আজমুলকে যখন পিটানো হচ্ছিল তখন তার ফোন থেকে মেহেদি আমাকে এক লাখ টাকা নিয়ে দ্রুত খুলনায় যেতে বলে। আজমুলের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি ঘটনার সময় মেস ম্যানেজার মেহেদী নিয়ে নেয়। পরে সেটি পুলিশ জব্দ করেছে। ফোন থেকে সম্ভবত সব আলামত মুছে দিয়েছে ওই মেহেদী।

এদিকে আজমুলকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় শনিবার রাতে খুলনার হরিণটানা থানায় চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি মামলা করেন তার বাবা কুতুব উদ্দীন। তারা হলেন- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফএমআরটি ডিসিপ্লিনের ১৭ ও ১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী রবিন ও মবিন, গণিত ডিসিপ্লিনের ১৯ ব্যাচের সাগর এবং এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের ২৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী ওবায়দুলের। ওবায়দুল ছাড়া বাকিরা সাবেক শিক্ষার্থী।

এতসব অভিযোগ যার বিরুদ্ধে সেই মেহেদির নাম আজমুল হত্যার এজাহারে কেন নেই এ প্রশ্নের জবাবে কুতুব উদ্দীন বলেন, ছেলে মারা যাওয়ার পর, ছোট ছেলের কাছ থেকে গতকাল রবিবার দুপুরে মেহেদির বিষয়ে সব কিছু জানতে পেরেছি। হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেসের ম্যানেজার মেহেদী। ওরা কয়েকজন সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে আমার ছেলেকে মেরেছে- এর যেন সুষ্ঠু বিচার হয়।

স্থানীয়দের দাবী- এসব বিষয়গুলো শুরু থেকেই তদন্ত হওয়া উচিত। আজমুলকে কেন শুক্রবার বিকেলের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা থেকে খুলনাতে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। একটা পরিবারের সাথে এক বছরেরও বেশি সময় প্রতারণা করা, টাকা হাতিয়ে নেয়া ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি জালিয়াতির সাথে সম্পৃক্ত যে মেহেদীর বিরুদ্ধে, সে যেন কোনো ভাবেই পার না পেয়ে যায় সে বিষয়ে অনুসন্ধান করা।

এদিকে আজমুল হত্যার দুই দিন পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তবে তারা বলছে আজমুল হত্যার ঘটনায় জড়িত কেও ছাড় পাবে না।

জানতে চাইলে হরিণটানা থানার ওসি ইকবাল হোসেন বলেন, এ হত্যাকাণ্ডটি নিয়ে আমাদের একটি বিশেষ টিম কাজ করছে। ইতোমধ্যে আমরা বেশ কিছু তথ্য পেয়েছি। সেই তথ্যের সুত্র ধরে তদন্ত করছি। এখনও কাওকে গ্রেফতার করতে না পারলেও শিগগিরই সবাইকে আইনের আওতায় আনতে পারবো।

তিনি আরও বলেন, তদন্তের স্বার্থে এই মূহুর্তে বেশি কিছু বলতে চাই না। তবে এটুকু বলতে পারি আমরা বেশ আগিয়েছি। সকল সোর্সের তথ্য আমরা নিবিড় ভাবে পর্যালোচনা করছি। কি কারনে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে তা শিগগিরই বেরিয়ে আসবে একইসাথে হত্যায় জড়িতদেরও গ্রেফতার করা হবে।

রাশেদ প্লাবন/এএস

শেয়ার করুন

এখনই

আরো পড়ুন