সাতক্ষীরা :গ্রীষ্ম এলেই প্রকৃতি যেন নতুন রূপে সেজে ওঠে। মাঠে-ঘাটে, গ্রামে-গঞ্জে আর শহরের অলিগলিতে তখন ছড়িয়ে পড়ে পাকা আমের মিষ্টি ঘ্রাণ। আর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপদ সাতক্ষীরা এখন সেই ঘ্রাণে মুখরিত। সাতক্ষীরা জেলায় এবার ৪ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। আমের এবার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন।
প্রতিবারের ন্যায় এবারও সাতক্ষীরার বিষমুক্ত সুস্বাদু প্রায় ১০০ মেট্রিক টন আম রপ্তানি হবে বিদেশে। এ জেলা থেকে এবার ৪০০ কোটি টাকার বেশি আম বিক্রি হবে বলে ধারণা করছে সাতক্ষীরা কৃষি অধিদপ্তর। সাতক্ষীরা আম চাষিরা স্থানীয় সহ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জেলার বিস্তীর্ণ আমবাগানে শুরু হয়েছে মৌসুমের প্রথম দিকের আম পাড়া। জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত আম পাড়া ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গত ৫ মে থেকে গোবিন্দভোগসহ আগাম জাতের আম পাড়া শুরু হয়েছে। আর আগামী ১৫ মে থেকে শুরু হবে বহুল জনপ্রিয় ও সুস্বাদু হিমসাগর আম সংগ্রহ।

মৌসুমের শুরুতেই সাতক্ষীরার বাজার, সড়ক ও কুরিয়ার সার্ভিসগুলোতে দেখা দিয়েছে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য। আমকে ঘিরে যেন পুরো জেলায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলা সাতক্ষীরা বললেই সুন্দরবন কিংবা দিগন্তজোড়া চিংড়ি ঘের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সাতক্ষীরাকে চিংড়ি মাছের জন্য হোয়াইট গোল্ড বলা হয় কিন্তু গত এক দশকে এই পরিচিতি বদলে দিয়েছে এখানকার আম।আবহাওয়া ও মাটির গুণাগুণের ভৌগোলিক কারণে দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় সাতক্ষীরার দেশ সেরা সুস্বাদু আম আগে ভাগেই পাকা শুরু হয়।
এবার মধু মাস জ্যৈষ্ঠ আসার আগেই সাতক্ষীরার বাজারে উঠতে শুরু করেছে বিষ মুক্ত গোবিন্দভোগ, গোপালভোগ, বোম্বাই, গোলাপখাস ও বৈশাখীসহ স্থানীয় জাতের সুস্বাদু বিভিন্ন প্রজাতির দেশি আম।বর্তমানে সাতক্ষীরা কে গ্রীন গোল্ড ম্যাংগো বলে ডাকা হচ্ছে।
জেলার সদর, তালা, কলারোয়া, কালিগঞ্জ, দেবহাটা ও আশাশুনি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য আমবাগান। সাতক্ষীরার মাটি, আবহাওয়া ও লবণাক্ততাসহ পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য আম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় এখানকার আমে একটি স্বতন্ত্র স্বাদ তৈরি হয়।
শুধু দেশেই নয়, সাতক্ষীরার আম এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাতক্ষীরার আমের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে আম শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সরোজমিনে দেখা যায় সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর বাজার এখন আমের বাজারে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন ভোর হতেই জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ভ্যান, ট্রলি, মিনি ট্রাক ও ছোট যানবাহনে করে আমবাগানের মালিক ও ব্যবসায়ীরা আম নিয়ে বাজারে আসছেন। পাইকাররা সেই আম কিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠাচ্ছেন। কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজনদের জন্য বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আম পাঠাচ্ছেন। আম মৌসুম ঘিরে কুরিয়ার সার্ভিস ও পরিবহন খাতেও সৃষ্টি হয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ।
বর্তমানে প্রতি মন আম পাইকারি বাজারে আকার ও মানভেদে প্রতি মণ গোবিন্দভোগ ও গোপালভোগ বিক্রি হচ্ছে ১৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫০০ টাকায়। তবে খুচরা বাজারে এই আমের দাম ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে এ আম রাজধানী সহ বিভিন্ন জায়গায় কুরিয়ারে পাঠাতে প্রতি কেজিতে গড়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। তবুও সাতক্ষীরার আমের স্বাদ ও সুনামের কারণে মানুষ আগ্রহ নিয়ে এই আম সংগ্রহ করছেন।
আম চাষি শাহিন হোসেন বলেন, এ বছর আমের উৎপাদন খুবই ভালো। তবে, দাম নিয়ে শঙ্কায় আছি। আমাদের সংকট অনেক। হিমাগার না থাকায় বাজারের ক্রেতারা যা দাম দেন, তাতে আমাদের বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয়। এছাড়া শহরের সুলতানপুর বড়বাজার ছাড়া আমাদের অন্যখানে আম বিক্রির কোন মোকাম গড়ে না ওঠায় আমরা আমের দামটা প্রকৃত সঠিকভাবে পাচ্ছি কিনা বোঝার উপায় থাকে না।
সুলতানপুর বড়বাজারের আম ব্যবসায়ী কবির হোসেন বলেন, এবার গাছে প্রচুর আমের ফলন হয়েছে। তাই বাজারে সরবরাহও বেশি। তবে, আমের দাম তুলনামূলক কম হলেও ফলন বেশি হওয়ায় চাষিরা লাভবান হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বাজারে আম বিক্রি করতে আসা তালার মোসলেম বলেন, গোবিন্দভোগ আম প্রতি মণ ১৬০০ টাকা দাম চেয়েছি। কিন্তু ব্যবসায়ীরা ১৩০০ থেকে ১৫০০ টাকার বেশি দাম বলছেন না।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনির হোসেন জানান, আম পরিপক্ক হওয়ার প্রথম থেকেই ‘মাসজুড়ে আম ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা রোধে প্রশাসনিক তৎপরতা মাঠে আছে থাকবে। ব্যবসায়ীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কোনো প্রকার কেমিক্যাল-মিশ্রিত আম বাজারজাত করা যাবে না। ধরা পড়লে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্দেশনা একটাই: পরিপক্ব নিরাপদ বিষমুক্ত আম বাজারজাত করতে হবে।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন সাতক্ষীরা আম এখন দেশের সব জায়গায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এবারও সাতক্ষীরা থেকে ১০০টন আম বিদেশে রপ্তানি করা হবে। আমরা সার্বক্ষণিক আম চাষিদের পরামর্শ ও সহযোগিতা করে আসছি।এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ও বাজারে আমের ভালো দাম পাওয়ায় আম চাষীরা খুব খুশি।
আব্দুল মোমিন/এনডি/জেএফজে



