সোমবার, ১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৩০শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ৩রা রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

দ্বিতীয় পদ্মা-যমুনা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের

দ্বিতীয় পদ্মা-যমুনা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের

ঢাকা : দ্বিতীয় পদ্মা ও দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় হবে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, অন্যটি বিদ্যমান যমুনা সেতুর পাশাপাশি কোনো স্থানে। ইতোমধ্যে পরিকল্পনা নিয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রকল্প দুটির জন্য রাখা হয়েছে অর্থ বরাদ্দ। এটি বিএনপি সরকারের প্রথম উন্নয়ন বাজেট।

সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদ্যমান যমুনা সেতু ও দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে চাপ বাড়ায় বিকল্প অবকাঠামো হিসেবে নতুন সেতু নির্মাণ জরুরি হয়ে উঠেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সমীক্ষা শেষে রুট, নকশা ও ব্যয়সহ বিস্তারিত প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করা হবে।

জানা গেছে, দ্বিতীয় পদ্মা ও যমুনা সেতু নির্মাণে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ফ্রান্স, কোরিয়া ও বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কাজ করছে। তাদের সমীক্ষা শেষ হওয়ার পরই শুরু হবে মূল প্রকল্পের কাজ। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০২৭ সালের মধ্যে স্টাডি রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।

এই সমীক্ষার মাধ্যমেই সেতু দুটির সম্ভাব্য রুট, অ্যালাইনমেন্ট, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং সেতুর ওপর রেলপথের অবস্থান নির্ধারণ করা হবে। এছাড়া বিদ্যমান যমুনা সেতুর সক্ষমতা আগামী ৫ থেকে ৬ বছরের মধ্যে পূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই দ্রুত সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

দ্বিতীয় যমুনা-দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর নির্মাণ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদাউস বলেন, প্রতিনিয়তই ট্রাফিক বাড়ছে। সেতু নির্মাণ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এজন্যই আমরা দ্রুত সময়ে এটা নির্মাণের কথা ভাবছি। দ্বিতীয় পদ্মা ও যমুনা সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা নিয়ে একসঙ্গে স্টাডি চলছে। স্টাডি শেষে ডিপিপি প্রণয়ন করা হবে, যেখানে ব্যয়, অবস্থান, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থসহ বিস্তারিত নির্ধারণ হবে। এ প্রকল্পে ফ্রান্স-কোরিয়ান ইআরএমসি কোম্পানিকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় হবে। এটা সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার। দুটি সেতু নির্মাণের বিষয়ে স্টাডি করছি। আমরা আলাদাভাবে নয় একই সঙ্গে স্টাডি করছি। স্টাডির পরই ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) তৈরি হবে। এর পরে সেতু দুটির ব্যয়, অবস্থান, নির্মাণের সময়কাল, সেতু দুটির দৈর্ঘ্য প্রস্থসহ বিস্তারিত তথ্য জানতে পারবো। আমরা এরই মধ্যে পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছি।

বিদ্যমান যমুনা সেতুর অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ৫ থেকে ৬ বছরে শেষ হবে এজন্যই দ্রুত সময়ে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের কথা ভাবছে সরকার। অন্যদিকে, ২০১২ সালে ১১ জুন রাজধানীর নয়াপল্টনে ১৮ দলীয় জোটের গণসমাবেশে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঘোষণা করেছিলেন, তারা ক্ষমতায় গেলে শুধু একটি নয়, দুটি পদ্মা সেতু করা হবে। একটি হবে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা দিয়ে এবং অপরটি রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া হয়ে। এখন যেহেতু মাওয়া দিয়ে একটি সেতু হয়েছে, তাই দৌলতদিয়া হয়ে দ্বিতীয় সেতু বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। নির্বাচনি ইশতেহারেও ছিল দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের বিষয়ে। এই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ প্রকল্প দুটি প্রক্রিয়াধীনের তালিকায় রেখেছে।

নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণে প্রথম বাজেটে উন্নয়ন কর্মসূচিতে দেওয়া হচ্ছে উচ্চাভিলাষী বরাদ্দ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে দেওয়া হবে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি বা ৬৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে সংগ্রহ করা হবে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা, বা ৩৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

আগামী ৯ মে নতুন এডিপি উঠতে যাচ্ছে পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায়। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠেয় সভায় সভাপতিত্ব করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এরপরই এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য যত দ্রুত সম্ভব উপস্থাপন করা হবে এনইসি বৈঠকে। সেখানে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রস্তাবিত এডিপির আকার ৩ লাখ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত এডিপিতে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু-দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণে ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন প্রকল্পেও দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মাস্টারপ্ল্যানের প্রতিবেদনে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া (গোয়ালন্দ) অ্যালাইনমেন্টে সেতু নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে।

সম্প্রতি রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় বাস নদীতে পড়ে বহু হতাহতের ঘটনার পর আবারও আলোচনায় এসেছে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু প্রকল্প। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ রুটে সেতু থাকলে এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যেত। পাশাপাশি ফেরি পারাপারের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগও লাঘব হতো।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩২ সালের মধ্যে সেতুটি নির্মাণের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। প্রস্তাবিত সেতুর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৪ দশমিক ৯ কিলোমিটার এবং এতে রেলসংযোগও থাকবে। দেশের রেল নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত হবে।

সেতু কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশের মধ্য ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক জেলার মানুষের জন্য বর্তমানে পদ্মা পারাপার একটি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, নড়াইল, গোপালগঞ্জ, যশোর ও মাদারীপুরসহ বিভিন্ন জেলার যাত্রীদের ঢাকায় যেতে এখনো দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাটের ওপর নির্ভর করতে হয়। যানবাহনের অতিরিক্ত চাপের কারণে অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাটে অপেক্ষা করতে হয়।

বর্তমানে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার। আবার সিরাজগঞ্জ ঘুরে যমুনা সেতু ব্যবহার করলে দূরত্ব বেড়ে প্রায় ২৭০ কিলোমিটার হয়। এ পথেও যানজট নিয়মিত সমস্যা। অন্যদিকে, পদ্মা সেতু হয়ে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় যেতে প্রায় ২২৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। যে কোনো পথেই বাস ও ট্রাক চলাচলে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা, কখনো আরও বেশি সময় লেগে যায়। মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা থেকে সময় লাগে আরও বেশি।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকা ও দেশের পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা আরও সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ হবে।

অন্যদিকে, ঢাকা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত মহাসড়ক এরই মধ্যে চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। পাশাপাশি এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়কের ১৯০ কিলোমিটার অংশ চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলমান, যা উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। এছাড়া যমুনা সেতুর উভয় পাশে সার্ভিস লেনসহ ছয় লেনের সড়ক নির্মাণের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। নতুন করে ঝিনাইদহ থেকে রূপপুর হয়ে হাটিকুমরুল পর্যন্ত ছয় লেন সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ঝিনাইদহের সঙ্গে উত্তরবঙ্গ ও ঢাকার সরাসরি যোগাযোগ আরও সহজ হবে।

তবে এসব উন্নয়ন কার্যক্রমের ফলে যমুনা সেতুর ওপর যানবাহনের চাপ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে যমুনা সেতু ব্যবহার করে প্রতিদিন গড়ে ২২ থেকে ২৩ হাজার যানবাহন চলাচল করছে এবং এ সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিদ্যমান সেতুটি তুলনামূলক সংকীর্ণ হওয়ায় প্রায়ই দুই পাড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।

এ প্রেক্ষাপটে রাজধানী ঢাকা ও দেশের উত্তরাঞ্চলের মধ্যে বিকল্প এবং নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করতে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শুরু করেছে সরকার।

সম্ভাব্য অ্যালাইনমেন্ট হিসেবে বগুড়া-জামালপুর জেলার মধ্যদিয়ে যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ, গাইবান্ধার বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ঘাট পর্যন্ত সেতু নির্মাণ অথবা অন্য কোনো উপযুক্ত করিডোর বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এছাড়া তৃতীয় সম্ভাব্য রুট হিসেবে বিদ্যমান যমুনা সেতুর আশপাশের এলাকাও আলোচনায় রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাপ সামাল দিতে এবং উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে দ্বিতীয় যমুনা সেতু এখন সময়ের দাবি।

এনডি/জেএফজে

শেয়ার করুন

এখনই

আরো পড়ুন