চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশন। ১৮৬২ সালে দর্শনা থেকে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত রেলপথ চালুর মধ্য দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে রেল যোগাযোগের সূচনা হয়। প্রায় ১৬৪ বছরের পুরোনো সেই ঐতিহাসিক রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন চুয়াডাঙ্গা।
পুরোনো অবকাঠামোর পরিবর্তে আধুনিক যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে ২০২৩ সালে চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশন আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নতুন দ্বিতল স্টেশন ভবন, প্রশস্ত প্ল্যাটফর্ম, প্ল্যাটফর্মে ছাউনি ও যাত্রীদের অপেক্ষার স্থানসহ বিভিন্ন কাজের জন্য প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১০ কোটি ১৮ লাখ টাকা।
২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরটিসি ও এসএইচজে জয়েন্ট ভেঞ্চারের চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয় ৫৪০ দিন। সে হিসাবে ২০২৫ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও পুরো কাজ শেষ হয়নি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম নির্মাণকাজ অনেকটাই এগিয়েছে। নতুন প্ল্যাটফর্মে ছাউনির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তবে নতুন দ্বিতল স্টেশন ভবনের কাজ এখনো শেষ হয়নি। কোথাও প্লাস্টার, কোথাও টাইলস, আবার কোথাও রং ও ফিনিশিংয়ের কাজ বাকি রয়েছে।
পুরোনো প্ল্যাটফর্ম ও স্টেশন ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে ফেলায় কমেছে বসার জায়গা। পর্যাপ্ত ও ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার নেই। মূল ভবনের বাইরে অস্থায়ী টিকিট কাউন্টার চালু থাকায় নতুন ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা যাত্রীদের অনেকেই পড়ছেন বিভ্রান্তিতে। নির্মাণকাজের মধ্যেই সীমিত জায়গায় চলছে স্টেশনের দাপ্তরিক কার্যক্রমও।
স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের অনেককেই পর্যাপ্ত বসার জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। কোনো কোনো যাত্রী প্ল্যাটফর্মের এক পাশে কিংবা অপেক্ষাকৃত অস্বস্তিকর জায়গায় বসে সময় কাটাচ্ছেন। ট্রেন বিলম্বিত হলে এ দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের ভোগান্তি হয় সবচেয়ে বেশি।
সৈয়দ আবু জাফর নামে এক যাত্রী বলেন, স্টেশনটি আধুনিক হচ্ছে। কিন্তু কাজটি দীর্ঘদিন ধরে চলায় যাত্রীদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। ট্রেনের জন্য অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়, অথচ বসার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ ও নারী-শিশুদের বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আমরা চাই দ্রুত কাজ শেষ করে প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা চালু করা হোক।
আরেক যাত্রী আলমগীর হোসেন বলেন, কয়েক বছর ধরে কাজ চলছে। এখনো ভবন পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। নির্মাণকাজ চলতে পারে, কিন্তু এই সময় যাত্রীদের বসার জায়গা, টয়লেট ও টিকিট সংগ্রহের ব্যবস্থা যেন ঠিক থাকে, সেটাও কর্তৃপক্ষের দেখা উচিত।
যাত্রী শাহনাজ পারভীন বলেন, স্টেশনে একজন নারী যাত্রীর জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে পরিষ্কার ও নিরাপদ টয়লেট এবং বসার জায়গা। কিন্তু নির্মাণকাজের কারণে এখন এসব সুবিধা খুবই সীমিত। বাচ্চা বা বয়স্ক কাউকে নিয়ে এলে সমস্যাটা আরও বেশি বোঝা যায়।
চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মিজানুর রহমান বলেন, নির্মাণকাজ চলমান থাকায় স্বাভাবিকভাবেই যাত্রীসেবা ও আমাদের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। পুরোনো ব্যবস্থার মধ্যেই সীমিত জায়গায় অফিসের কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। আমরা যতটা সম্ভব বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে যাত্রীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। নতুন ভবন ও অন্যান্য কাজ শেষ হলে এসব সমস্যা আর থাকবে না।
চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, নানা কারণে মাঝখানে নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। এখন আবার নিয়মিত কাজ চলছে। ভবনের মূল কাঠামোর কাজ অনেকটাই হয়ে গেছে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পুরো কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি।
যাত্রীদের প্রত্যাশা, শুধু নতুন ভবন নির্মাণের মধ্যেই যেন আধুনিকায়ন সীমাবদ্ধ না থাকে। স্টেশনটি বাস্তব অর্থেই যাত্রীবান্ধব করে তুলতে হবে। নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত বসার জায়গা, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক শৌচাগার, নিরাপদ অপেক্ষাগার, দৃশ্যমান টিকিট কাউন্টার এবং প্রয়োজনীয় তথ্যসেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করলেই এর পুরোপুরি সুফল ভোগ করতে পারবে সবাই।
এনডি/জেএন



