হজ্ব আরবি শব্দ। এর অর্থ নিয়ত করা, দর্শন করা, সঙ্কল্প করা, গমন করা, ইচ্ছা করা, প্রতিজ্ঞা করা। পরিভাষায় নির্দিষ্ট দিনে নিয়তসহ ইহরামরত অবস্থায় আরাফার ময়দানে অবস্থান করা এবং বায়তুল্লাহ শরীফ তাওয়াফ করা।
হজ্বের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং সুশৃঙ্খল। হাজিদের সুবিধার্থে এহরাম থেকে শুরু করে বিদায়ী তাওয়াফ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া এজন মুমিনের জ্ঞান থাকা আবশ্যক। হজ ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ। প্রতি বছর জিলহজ মাসে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লাখো মুসলিম মক্কায় সমবেত হন। হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা মূলত জিলহজ মাসের ৮ তারিখ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত চলে। হাজিদের প্রস্তুতির সুবিধার্থে ধারাবাহিক ধাপগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. এহরাম গ্রহণ (হজের সূচনা)
হজের প্রথম ধাপ হলো মিকাত (নির্ধারিত সীমানা) অতিক্রম করার আগেই হজের নিয়তে এহরাম পরিধান করা।

নিয়ম: পুরুষদের জন্য সেলাইবিহীন দুই টুকরো সাদা কাপড় এবং নারীদের জন্য শালীন সাধারণ পোশাক। এহরাম বাঁধার পর ‘তালবিয়াহ’ (লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক…) পাঠ করা শুরু করতে হয়।
২. মিনায় অবস্থান (৮ই জিলহজ)
হজের মূল কার্যক্রম শুরু হয় ৮ই জিলহজ মিনায় গমনের মাধ্যমে।
কার্যক্রম: এদিন মিনায় অবস্থান করে জোহর, আসর, মাগরিব, এশা এবং পরের দিনের ফজর—এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা সুন্নাত। এটি মূলত পরবর্তী কঠিন ধাপগুলোর জন্য মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতির সময়।
৩. আরাফাতের ময়দানে অবস্থান (৯ই জিলহজ – হজের মূল দিন)
৯ই জিলহজ সূর্যোদয়ের পর হাজিরা মিনা থেকে আরাফাতের ময়দানে গমন করেন। একেই হজের ‘মূল রুকন’ বলা হয়।
গুরুত্ব: এখানে জোহর ও আসর নামাজ একত্রে আদায় করা হয়। সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই ময়দানে অবস্থান করে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি ও দোয়া করা প্রধান কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আরাফাতই হলো হজ।”
৪. মুজদালিফায় রাত যাপন (৯ই জিলহজ রাত)
আরাফাত থেকে সূর্যাস্তের পর হাজিরা মুজদালিফার দিকে রওনা হন।
কার্যক্রম: এখানে মাগরিব ও এশা নামাজ একত্রে আদায় করতে হয়। খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন এবং শয়তানকে মারার জন্য এখান থেকেই সাধারণত ছোট ছোট পাথর সংগ্রহ করা হয়।
৫. শয়তানকে পাথর মারা ও কোরবানি (১০ই জিলহজ)
১০ই জিলহজ সকালে হাজিরা পুনরায় মিনায় ফিরে আসেন। এটি অত্যন্ত ব্যস্ততম দিন।
রামি: বড় শয়তানকে (জামারাতুল আকাবা) ৭টি পাথর মারা।
কোরবানি ও হলক: পাথর মারার পর পশু কোরবানি করা এবং মাথা মুণ্ডন (হলক) বা চুল ছোট করার মাধ্যমে এহরাম আংশিক ত্যাগ করা।
৬. তওয়াফে জিয়ারাহ ও সাঈ (১০-১২ই জিলহজ)
পাথর মারা ও কোরবানি শেষে হাজিরা মক্কায় গিয়ে কাবা শরীফ প্রদক্ষিণ (তাওয়াফ) করেন এবং সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার দৌড়ান (সাঈ)। এটি হজের অন্যতম ফরজ কাজ।
৭. পুনরায় মিনায় অবস্থান ও পাথর মারা (১১ ও ১২ই জিলহজ)
বাকি দুই দিন হাজিরা মিনায় অবস্থান করেন এবং প্রতিদিন ছোট, মেজো ও বড়—এই তিনটি শয়তানকে ৭টি করে পাথর মারেন। ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগে মিনা ত্যাগ করতে হয়।
হাজিদের জন্য জরুরি পরামর্শ:
ধৈর্য ধারণ: হজের সময় প্রচুর ভিড় ও গরম থাকে, তাই সবসময় ধৈর্য বজায় রাখা জরুরি।
দিকনির্দেশনা: নিজের মোয়াল্লেম বা দলের সাথে থাকা এবং ম্যাপ বা স্মার্টফোন অ্যাপের সাহায্য নেওয়া।
বিশুদ্ধ পানি: প্রচুর পরিমাণে জমজমের পানি পান করা যাতে ক্লান্তি কম হয়।
হজ আত্মশুদ্ধির এক মহান সফর। সঠিক নিয়ম মেনে এবং প্রতিটি ধাপের তাৎপর্য বুঝে হজ আদায় করলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার আশা রাখা যায়।



