পারমাণবিক জ্বালানি ‘ইউরেনিয়াম’ লোডিংয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসে সূচিত হলো অনন্য এক অধ্যায়। আর এর মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পরমাণু শক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিচালন পর্বে প্রবেশ করল বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার বেলা ৩ টার পর পাবনার ঈশ্বরদীতে এ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে (ইউনিট-১) ফুয়েল লোডিং হয়।
টানা এক দশকের অবকাঠামো নির্মাণ ও জটিল কারিগরি সক্ষমতা অর্জনের পর অবশেষে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে পা রাখল বাংলাদেশ।

প্রকল্পের ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস জানান, রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় এবং দেশীয় দক্ষ প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে বিকাল থেকে রিঅ্যাক্টর কোরে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন করা শুরু হয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন জানান, প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শেষ হতে ৪৫ দিন সময় লাগবে। জুলাইয়ের শেষে অথবা আগস্টের শুরুর দিকেই প্রথম ইউনিট থেকে অন্তত ৩শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। সেই সঙ্গে চলতি বছরের শেষ নাগাদ বা আগামী বছরের শুরুতে প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে ১২০০ মেগাওয়াট নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ মিলবে।
পদ্মা নদীর তীরে ঈশ্বরদীতে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পে রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়েছে। এখানে দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর ব্যবহার করা হয়েছে। দুটি ইউনিট পূর্ণ উৎপাদনে গেলে এখান থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, যা দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশেরও বেশি পূরণ করবে।
এর আগে জ্বালানি খাতের এই মেগাপ্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সকালে ওই কেন্দ্রের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোসাটমের মহাপরিচালক (ডিজি) আলেক্সি লিখাচেভ ১৮ জনের টিম নিয়ে একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে রাশিয়া থেকে ঢাকায় আসেন।
অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং রাশিয়ার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা প্রকল্প এলাকায় উপস্থিত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
ইউনিট-১ এর নতুন পারমাণবিক জ্বালানি
নতুন পারমাণবিক জ্বালানি মূলত লো-এনরিচড ইউরেনিয়াম (যাতে ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর মাত্রা ২.৪ শতাংশ থেকে ৪.৯৫ শতাংশ) থেকে তৈরি ইউরেনিয়াম ডাই-অক্সাইড পেলেট দিয়ে গঠিত। কয়লা বা তেলের মতোই এসব পেলেট তাপ উৎপন্ন করে, যা থেকে বিদ্যুৎ তৈরি হয়। প্রতিটি পেলেটের ওজন মাত্র ৪.৫ থেকে ৫ গ্রাম, কিন্তু শক্তি উৎপাদন ক্ষমতায় এটি প্রায় এক টন কয়লার সমপরিমাণ। একটি মাত্র জ্বালানি পেলেট কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশের একটি সাধারণ পরিবারের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম— তাও কোনো কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই।
এই পেলেটগুলো জিরকোনিয়াম অ্যালয়ের নল, অর্থাৎ ফুয়েল রডে রাখা হয়, যা বিকিরণ প্রতিরোধে সুরক্ষাবর্ম হিসেবে কাজ করে। এসব ফুয়েল রড কয়েক বছর রিঅ্যাক্টরের কোরে অবস্থান করে, এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী বদলানো হয়।
একাধিক ফুয়েল রড একত্রে একটি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি গঠন করে। প্রতিটি অ্যাসেম্বলির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪.৬ মিটার এবং এতে প্রায় ৫৩৪ কেজি লো-এনরিচড ইউরেনিয়াম ডাই-অক্সাইড থাকে। স্টিল ও জিরকোনিয়ামসহ প্রতিটি অ্যাসেম্বলির মোট ওজন প্রায় ৭৫০ কেজি এবং এতে ৩১২টি ফুয়েল রড থাকে।
ইউনিট-১ এর রিঅ্যাক্টর কোরে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি ব্যবহার করা হবে, যেগুলো পানি দিয়ে শীতল রাখা হবে। প্রথম ধাপে অতিরিক্ত একটিসহ মোট ১৬৪টি অ্যাসেম্বলি ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায়। এতে করে জ্বালানি লোডিংয়ের আগে প্রয়োজনীয় পরিদর্শন, গুণগত মান যাচাই, কাঠামোগত অখণ্ডতা পরীক্ষা এবং জ্বালানি হ্যান্ডলিং ও লোডিং বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রস্তুতির সুযোগ তৈরি হয়।
ইয়াসির আরাফাত/এনডি/এএস



