দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ভারত লাগোয়া সীমান্ত জেলা চুয়াডাঙ্গায় দেখা মিলছে নিত্য নতুন মাদকের। সেই সাথে পাচারের ধরণ পালটেছে। ফেনসিডিল, গাজা ও ইয়াবার পাশাপাশি বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে উদ্ধার হচ্ছে স্ক্রাফ সিরাপ, ট্যাপেন্টাডলসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্য। একই সঙ্গে মিলছে বুপ্রেনরফাইন ইনজেকশন।
মাদক পাচারের ধরন পরিবর্তনের পাশাপাশি জেলার অভ্যন্তরে সরবরাহব্যবস্থা নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে মূল কারবারিরা আড়ালে থেকে কিশোর, শিক্ষার্থী, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও নারীদের ব্যবহার করছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচারের অন্যতম পরিচিত উপকরণ ফেনসিডিল ও গাজা। সেই সাথে মরনব্যাধি ইয়াবার বিস্তারও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় ট্যাবলেট উদ্ধারের পরিসংখ্যান মাদক সরবরাহের ধরনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে স্ক্রাফ সিরাপ, ট্যাপেন্টাডলসহ বিভিন্ন নেশাদ্রব্যের উপস্থিতি মাদক নিয়ন্ত্রণে নতুন করে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।

চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবির কয়েক বছরের অভিযানের তথ্য পর্যালোচনায় এ পরিবর্তনের একটি চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত বিজিবির অভিযানে ১১ হাজারের বেশি নেশাজাতীয় ট্যাবলেট ও ইয়াবা উদ্ধারের তথ্য রয়েছে। পরবর্তী এক বছরে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত উদ্ধার করা হয় ২৫ হাজার ৪৮৫ পিস বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় ট্যাবলেট।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা এসব ট্যাবলেটের মধ্যে ভায়াগ্রা, সেনেগ্রা ও ট্যাপেন্টাডল ছিল। একই সময়ে সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১০ হাজার ৬১৭ বোতল ফেনসিডিল এবং ২৩৮ কেজিরও বেশি গাজা উদ্ধার করা হয়।
তবে উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণ দিয়ে জেলার প্রকৃত মাদক পরিস্থিতি পুরোপুরি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কারণ, কোনো সময়ে অভিযান বেশি হওয়া, পাচারকারীদের রুট পরিবর্তন, সীমান্তে নজরদারির মাত্রা এবং মাদক পরিবহনের কৌশল পরিবর্তনের মতো বিষয় উদ্ধারসংখ্যাকে প্রভাবিত করতে পারে। তারপরও এক বছরের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় সিরাপ, ট্যাবলেট উদ্ধারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
দামুড়হুদা, দর্শনা ও জীবননগরের বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই মাদক পাচারের ঝুকিতে রয়েছে। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় ফেনসিডিল, গাজা, ইয়াবা, স্ক্রাফ সিরাপ ও ট্যাপেন্টাডল উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন অভিযানে বুপ্রেনরফাইন ইনজেকশন উদ্ধারের ঘটনাও সামনে এসেছে।
কিন্তু মাদক পাচারের বিষয়টি এখন শুধু সীমান্তে আটকে নেই। সীমান্ত অতিক্রমের পর এসব মাদক কীভাবে জেলার বিভিন্ন এলাকায় পৌছাচ্ছে, কোন পরিবহনব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে কারা সরবরাহ করছে, সেসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে চুয়াডাঙ্গা শহরের একটি কুরিয়ার সার্ভিসের সামনে থেকে ৫ হাজার ৭০০ পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ঘটনাটি সীমান্ত থেকে জেলার অভ্যন্তরে মাদক পরিবহনের সম্ভাব্য পথ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করে। সীমান্তে প্রবেশের পর মাদক পরিবহন, কুরিয়ার কিংবা অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরবরাহের চেষ্টা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এ কারণে শুধু সীমান্ত এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেই মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। জেলার অভ্যন্তরে পরিবহন ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং মাদক কোথা থেকে আসছে, কোথায় যাচ্ছে ও কারা এর নিয়ন্ত্রণ করছে, তা অনুসন্ধান করাও জরুরি।
মাদকের ধরন পরিবর্তনের আলোচনায় সাম্প্রতিক সময়ে ট্যাপেন্টাডল ও স্ক্রাফ সিরাপ বিশেষভাবে সামনে এসেছে। বিভিন্ন অভিযানে কখনো শত শত, আবার কখনো হাজার হাজার পিস সিরাপ ও ট্যাবলেট উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি বুপ্রেনরফাইন ইনজেকশন উদ্ধারের ঘটনাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে এসেছে।
ট্যাপেন্টাডল একটি ব্যথানাশক ওষুধ, যা অপব্যবহারের মাধ্যমে নেশার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে। অন্যদিকে বুপ্রেনরফাইন কাশির সিরাপ স্ক্রাফ চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি ওষুধ। তবে এসব ওষুধের অপব্যবহার ও অবৈধ সরবরাহের অভিযোগ থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে ওষুধের উৎস, বিক্রয়ব্যবস্থা ও সরবরাহের পথ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
প্রচলিত মাদকদ্রব্যের পাশাপাশি ওষুধজাত নেশাদ্রব্যের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আলাদা ধরনের নজরদারি প্রয়োজন। কারণ, এসব ওষুধের বৈধ চিকিৎসাগত ব্যবহার রয়েছে। ফলে কোনটি বৈধ চিকিৎসার প্রয়োজনে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং কোনটি অবৈধভাবে নেশার উদ্দেশ্যে সরবরাহ করা হচ্ছে, তা শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
চুয়াডাঙ্গায় মাদক পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হচ্ছে কিশোর ও তরুণদের সম্পৃক্ততার আশঙ্কা। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় শিক্ষার্থীদের মাদক পরিবহনে ব্যবহার করার বিষয়ে সম্প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার।
জীবননগরে আয়োজিত মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক এক অনুষ্ঠানে তিনি জানান, পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাদক বহনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিক ও অনার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থী-তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তির প্রবণতা নিয়েও সতর্ক করেন তিনি।
জেলা প্রশাসকের বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের মাদক পরিবহনে ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসায় কিশোরদের সুরক্ষা এবং মাদক সরবরাহের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্ব পেয়েছে।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, মাদক কারবারের মূল নিয়ন্ত্রকরা অনেক সময় নিজেদের আড়ালে রেখে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী ও সহজে প্রভাবিত করা যায়, এমন ব্যক্তিদের ব্যবহার করছে। বিশেষ করে মাদকাসক্ত স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের ধীরে ধীরে সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, শুরুতে যারা মাদক সেবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তাদের পরবর্তী সময়ে মাদক বহন, নির্দিষ্ট স্থানে পৌছে দেওয়া কিংবা নতুন সেবনকারী সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও ঘটনার সুনির্দিষ্ট তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
শুধু কিশোর ও শিক্ষার্থী নয়, নারীদেরও মাদক পরিবহন ও সরবরাহের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে এর মাধ্যমে মূল কারবারিরা নিজেদের আড়ালে রাখার সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে অপরাধের ঝুকিতে পড়তে পারে সমাজের সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণ অংশগুলোর একটি,কিশোর, শিক্ষার্থী, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও নারীরা।
মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে শুধু মাদকসহ আটক হওয়া ব্যক্তি কিংবা খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, মাদক সংগ্রহ, অর্থায়ন, পরিবহন ও সরবরাহের সঙ্গে কারা জড়িত, তা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
কারা মাদক কেনার অর্থ জোগান দিচ্ছে, কারা সীমান্ত থেকে চালান সংগ্রহ করছে, কার নির্দেশে তা পরিবহন করা হচ্ছে এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় কারা সরবরাহের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে,এসব প্রশ্নের উত্তর খুজে বের করা জরুরি।
বিশেষ করে মাদকাসক্ত শিক্ষার্থী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের যদি কারবারিরা নিজেদের নেটওয়ার্কে ব্যবহার করে থাকে, তাহলে তাদের শুধু অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে পেছনে থাকা মূল নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মাদকাসক্ত কিশোর-তরুণদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
এ কারণে মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি নেপথ্যের অর্থদাতা, সরবরাহকারী, স্থানীয় পর্যায়ের বিক্রেতা ও মূল নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রসিকিউটর আকুব্বার আলীর ভাষ্য, মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারী উভয়ের বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হচ্ছে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সামারি ট্রায়াল ব্যবস্থাও কার্যকর রয়েছে।
তার মতে, মাদক এখন এমন একটি সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে, যা কেবল কোনো একটি সংস্থার অভিযান দিয়ে নির্মূল করা সম্ভব নয়। মাদক প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষসহ সবাইকে সম্পৃক্ত হতে হবে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মারুফ সরোয়ার বাবুর মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে দ্রুত বিচার বা সামারি ট্রায়াল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অল্প সময়ে বিচার শেষ করে শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের নিরুৎসাহিত করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান জানান, সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবির নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সীমান্তে নিয়মিত টহল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতেও সীমান্তে অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে এসব কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবির খান জানান, মাদকসংক্রান্ত মামলায় দ্রুত আইনগত প্রক্রিয়া শেষ করে সাজা নিশ্চিত করার ফলে অপরাধীদের মধ্যে আইনের ভয় তৈরি হচ্ছে। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার কার্যক্রমের পাশাপাশি আত্মসমর্পণের সুযোগও রাখা হচ্ছে।
তার দাবি, অতীতে মাদক মামলার আসামিদের অনেকে দ্রুত জামিন পেয়ে যেতেন। বর্তমানে দ্রুত বিচার ও শাস্তির কারণে মাদক ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আইনি পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। চুয়াডাঙ্গাকে মাদকমুক্ত করতে জেলা পুলিশ ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে বলে জানান জেলা পুলিশের শীর্ষ এই কর্মকর্তা।
জেএন/এএস



