গৌরব, ঐতিহ্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার দায়িত্ববোধের ৬০ বছর পূর্ণ করলো চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাব। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটির গৌরবময় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল শনিবার দিনভর বর্ণাঢ্য আয়োজনে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেন প্রেসক্লাবের সদস্যরা। আয়োজনটি পরিণত হয় নবীন-প্রবীণ সাংবাদিকদের এক মিলনমেলায়।
বেলা পৌনে ১১টায় প্রেসক্লাব চত্বর থেকে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে প্রেসক্লাবে এসে শেষ হয়। পরে প্রেসক্লাব মিলনায়তনে এক স্মৃতিচারণ ও আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি নাজমুল হক স্বপনের সভাপতিত্বে আলোচনাসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম সনি।
বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি চুয়াডাঙ্গা ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক হুসাইন মালিক’র সঞ্চলনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শরীফুজ্জামান শরীফ, চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবির খান, চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর সিদ্দিকুর রহমান, চুয়াডাঙ্গা সম্পাদক পরিষদের আহ্বায়ক সরদার আল আমিন, অ্যাড. সেলিম উদ্দীন খান, অ্যাড. এমএম শাহজাহান মুকুল, বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি চুয়াডাঙ্গা ইউনিটের সভাপতি অ্যাড. রফিকুল ইসলাম।
সভায় স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য দেন চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রবীণ সদস্য কামরুল আরেফিনসহ অন্যান্য প্রবীণ সাংবাদিকেরা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার, প্রেসক্লাবের সকল সদস্য ও সাংবাদিকদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। রাজধানী থেকে দূরে অবস্থিত হলেও চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাব দীর্ঘদিন ধরে নিরপেক্ষ ও উন্নয়নমূলক সাংবাদিকতার ধারা বজায় রেখেছে।
সাংবাদিকতার গুরুত্ব ও বস্তুনিষ্ঠতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে লুৎফুন নাহার বিখ্যাত আমেরিকান সাংবাদিক ওয়াল্টার লিপম্যান এবং ব্রিটিশ প্রকাশক লর্ড উত্তরক্লিফের উক্তি উল্লেখ করে বলেন, ‘সত্যের মুখোমুখি করে অন্যায় বা ভুলকে লজ্জিত করাই সাংবাদিকতার প্রধান দায়িত্ব। যা কেউ প্রকাশ করতে চায় না, সেটাই আসল সংবাদ; আর বাকি সব প্রচার বা বিজ্ঞাপন।’
তিনি আরও বলেন, সমাজ বর্তমানে বিভিন্ন অপপ্রচার ও নীতিবাচকতায় ছেয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বস্তুনিষ্ঠ খবর পরিবেশন ও সত্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক আলো ছড়াতে সাংবাদিকদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
জেলা প্রশাসক বলেন, চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের অবকাঠামোগত নিরাপত্তার বিষয়ে জেলা প্রশাসক ভবনটির স্থায়িত্ব ও ভূমিকম্প সহনশীলতার দিকটি খেয়াল রাখার পরামর্শ দেন। প্রেসক্লাবের সার্বিক উন্নয়ন ও যেকোনো প্রয়োজনে জেলা প্রশাসন সবসময় সাংবাদিকদের পাশে থাকবে বলে তিনি আশ্বাস ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, আগামী দিনে চুয়াডাঙ্গা তথা বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রবীণ সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নতুন প্রজন্মকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তায়।
দেশ বর্তমানে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশের ভবিষ্যৎ স্থায়িত্ব ও উন্নতির জন্য আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।’
নিজের ক্যারিয়ার ও পেশাগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, রাজনীতি করলেও সংবাদপত্রের সম্পাদনা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি কখনোই হস্তক্ষেপ করেননি। নিরপেক্ষতা বজায় রেখে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতায় তিনি বিশ্বাস করেন।
প্রেসক্লাবের বিদ্যমান অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দুইভাগে বিভক্ত সাংবাদিকদের ঐক্যের বিষয়ে জোর দিয়ে তিনি বলেন, বিভেদ ভুলে সকল সাংবাদিকদের এক ছাতার নিচে আসতে হবে। ছাড় দেয়ার মানসিকতা নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রেসক্লাবকে শক্তিশালী করার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।
এছাড়া, সাংবাদিকদের কল্যাণ ও নিরাপত্তার জন্য একটি স্থায়ী কল্যাণ ফান্ড গঠনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রেসক্লাবের ভবন নির্মানের পর এখন আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ফান্ড তৈরি করা, যেন দুর্যোগে বা বিপদে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ানো যায়। সুনির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় এই ফান্ড থেকে সংবাদকর্মীদের সার্বিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবির খান বলেন, ‘সাংবাদিকতা সমাজের দর্পণ। সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পরিবেশনের মাধ্যমে সাংবাদিকেরা জনসচেতনতা সৃষ্টি করেন এবং সমাজের অসংগতি তুলে ধরেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা অপরিহার্য।’
তিনি জেলা পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীদের পারস্পরিক পেশাগত সৌহার্দ্য অব্যাহত রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্য উপজেলা ও জেলা প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান।
অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- আলমডাঙ্গা উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি নাহিদ হাসান, সাধারণ সম্পাদক শাওন আহমেদ, জীবননগর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি এম আর বাবু, সাধারণ সম্পাদক নুর আলম, জীবননগর প্রেসক্লাবের সভাপতি ফয়সাল মানিক, সাধারণ সম্পাদক রিপন হোসেন, দামুড়হুদা প্রেসক্লাবের সভাপতি শামসুজ্জোহা পলাশ, সিনিয়র সহ-সভাপতি হাফিজুর রহমান কাজল ও আলমডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি বশিরুল আলমসহ জেলা ও উপজেলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
আলোচনাসভা শেষে অতিথিরা শুভ কেক কেটে চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের ৬০ বছর পূর্তির আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ করণীয় ও জনকল্যাণমুখী সমাজ গঠনে চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাব আগামী দিনেও অগ্রণী ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এমভি/এএস



