শনিবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১১ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১৫ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

৭ কোটি টাকার বর্জ্য শোধনাগার পরিণত হয়েছে আবর্জনার ভাগাড়ে

৭ কোটি টাকার বর্জ্য শোধনাগার পরিণত হয়েছে আবর্জনার ভাগাড়ে

চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা এলাকার বর্জ্যকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে পরিবেশ দূষণ কমানো, বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার উৎপাদন এবং একটি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষে নির্মাণ করা হয়েছিল আধুনিক স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ও পয়োবর্জ্য শোধনাগার। কিন্তু নির্মাণের প্রায় তিন বছর না যেতেই সেই প্রকল্প এখন পরিণত হয়েছে আবর্জনার ভাগাড়ে।

চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার বুজরুকগড়গড়িতে প্রায় ৯ বিঘা বা ৩ একর জমির ওপর প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ও পয়োবর্জ্য শোধনাগারটির এমন বেহাল দশা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কোটি টাকার অবকাঠামো ও আধুনিক যন্ত্রপাতি পড়ে থাকলেও বর্জ্য শোধন কিংবা জৈব সার উৎপাদনের মূল কার্যক্রমই শুরু হয়নি। উল্টো প্রতিদিন সেখানে জমছে টন টন পচনশীল বর্জ্য, পলিথিন ও প্লাস্টিক।

পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নতিকরণ সেক্টর প্রকল্পের আওতায় চুয়াডাঙ্গায় স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ও পয়োবর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা বর্জ্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থাপনা করা। বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার উৎপাদনের পরিকল্পনাও ছিল। এ জন্য নির্মাণ করা হয় ডাম্পিং স্টেশনের পাম্প হাউস, ফিল্টার, পলিশিং ও সেটেলমেন্ট ট্যাংকসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিকল্পনার সঙ্গে বর্তমান চিত্রের যেন কোনো মিল নেই।

সরেজমিনে বুজরুকগড়গড়ির ওই স্থাপনায় গিয়ে দেখা যায়, শোধনাগারের প্রবেশপথ ও চারপাশ ঘন লতাপাতা ও আগাছায় ঢেকে গেছে। ভেতরে থাকা পাম্প হাউস, ফিল্টার, পলিশিং ও সেটেলমেন্ট ট্যাংকসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ব্যবহারের বাইরে পড়ে রয়েছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব যন্ত্রপাতির অনেকগুলো নষ্ট হওয়ার পথে। শুধু যন্ত্রপাতিই নয়, কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোরও যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না।

শোধনাগারটির দেখাশোনার জন্য একটি অফিস কক্ষ থাকলেও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের বড় একটি সময় সেটি তালাবদ্ধ থাকে। ফলে এত বড় একটি প্রকল্পের নিয়মিত কার্যক্রম, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শোধনাগারে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ফেলা হলেও তা কার্যকরভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে না। পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ড থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ভ্যান ও ট্রাকযোগে বর্জ্য সংগ্রহ করে প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট পরপর ওই ডাম্পিং স্টেশনে ফেলছেন। এতে প্রতিদিন আনুমানিক ১০ থেকে ১২ টন পচনশীল বর্জ্য, পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতলসহ বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা জমা হচ্ছে।

দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এভাবে বর্জ্য জমে তৈরি হয়েছে বিশাল আবর্জনার স্তূপ। সেখান থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। বর্জ্যের কারণে আশপাশের পরিবেশও দূষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। শুধু বসতবাড়ি বা জনবসতিই নয়, এর প্রভাব পড়ছে পাশের কৃষিজমিতেও। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাতাসে ডাম্পিং স্টেশনের পলিথিন ও অন্যান্য হালকা বর্জ্য উড়ে গিয়ে আশপাশের ফসলের মাঠে পড়ছে। দুর্গন্ধের কারণে কৃষকদের মাঠে কাজ করতেও সমস্যা হচ্ছে।

বুজরুকগড়গড়ি বনানীপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ জনির ভাষ্য, যে উদ্দেশ্যে ডাম্পিং স্টেশনটি তৈরি করা হয়েছিল, তার কোনো বাস্তবায়ন তারা দেখছেন না। তার অভিযোগ, এখানে মূলত শুধু ময়লা ফেলা হচ্ছে, বর্জ্য শোধন বা ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম চোখে পড়ছে না।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর কাদির সোহান বলেন, স্টেশনটি কার্যকর না হওয়ায় পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। সারাক্ষণ দুর্গন্ধ থাকে এবং বাতাসের সঙ্গে সেই দুর্গন্ধ আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

কৃষক আবু কাশেম বলেন, দুর্গন্ধের কারণে মাঠে কাজ করাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বাতাসে আবর্জনা উড়ে ফসলের জমিতে পড়ায় কৃষিজমিরও ক্ষতি হচ্ছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন যে প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক অবকাঠামো তৈরি করা হলো, সেটি যদি বছরের পর বছর কার্যকর না হয়, তাহলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হলো? নির্মাণের পর থেকেই কেন নিয়মিতভাবে এটি চালু রাখা গেল না, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে হচ্ছে এবং প্রকল্পটি সচল করতে এত সময় লাগছে কেন,এসব প্রশ্নেরও জবাব চান তারা।

অন্যদিকে, শোধনাগারটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ইনচার্জ জয়নাল আবেদিন বলেন, শোধনাগারে কবে থেকে উৎপাদন শুরু হবে, সে বিষয়ে তার জানা নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলতে পারবেন। তিনি শুধু দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছেন।

চুয়াডাঙ্গা পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী শরীফুল ইসলাম বলেন, শোধনাগারটি চালু করার জন্য একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে। চুক্তি সম্পন্ন হলে কার্যক্রম শুরু হবে। পাশাপাশি দ্রুত চালুর জন্য আরেকটি প্রকল্পের প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্মকর্তারা সম্প্রতি এলাকা পরিদর্শন করে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। দ্রুতই স্টেশনটি চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।

তবে বাস্তবতা হলো কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক বর্জ্য শোধনাগারটি এখনও তার মূল কাজ শুরু করতে পারেনি। এরই মধ্যে অব্যবহৃত অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার ঝুকিতে পড়েছে, আর প্রতিদিন সেখানে জমছে নতুন নতুন বর্জ্য। ফলে একদিকে যেমন সরকারি অর্থে নির্মিত প্রকল্পের স্থায়িত্ব ও ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুকিও বাড়ছে।

সিপি/এমএস/এএস

শেয়ার করুন

এখনই

আরো পড়ুন