, || ||

আমের খোসা দিয়ে ৩ তরুণের বানানো ‘ম্যাংগো পিলটি’ সাড়া ফেলেছে

আমের খোসা দিয়ে ৩ তরুণের বানানো ‘ম্যাংগো পিলটি’ সাড়া ফেলেছে

ফেলে দেওয়া আমের খোসা থেকে তৈরি হচ্ছে চা! শুনতে অবাক লাগলেও, এমনই ব্যতিক্রমী চা তৈরী করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট উপজেলার তিন শিক্ষিত বন্ধু। তাদের তৈরি এই চায়ের নাম ‘ম্যাংগো পিলটি’। অল্প পরিসরে শুরু হয়েছে বাজারজাতকরণও। নতুন স্বাদের এই চা সাড়া ফেলেছে চা-প্রেমী ও দোকানিদের মধ্যে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই তিন উদ্যোক্তা আমজাত বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি আমের খোসা থেকে চা তৈরি করছেন। তাদের দাবি, দেশের ইতিহাসে এ ধরনের উদ্যোগ এটিই প্রথম। শুধু তা-ই নয়, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করে নিজেদের মেধা কাজে লাগিয়ে আমের খোসা শুকানোর যন্ত্রও তৈরি করেছেন তারা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলায় পড়াশোনা শেষ করে ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারে গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি আম নিয়ে কাজ করছেন মোহা. মাইনুল ইসলাম। চাকরির পেছনে না ছুটে তিনি এখন নিজ এলাকায় সফল উদ্যোক্তা।

বন্ধু মিঠুনের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে কৃষকদের আম ফেলে দেওয়া বা গরুকে খাওয়ানোর ঘটনা দেখে আম সংরক্ষণের পরিকল্পনা করেন তিনি। বিনা পুঁজিতে মিঠুনকে নিয়ে আমসত্ত্ব তৈরি শুরু করেন। কিন্তু খোলা মাঠে শুকানো ও চুলায় গরম করার কারণে আমসত্ত্বে ধোঁয়ার গন্ধ, পাখির পালক ও ছাগলের লোম দেখতে পেয়ে প্রথমেই হোঁচট খান তারা।

টাকা না থাকলেও যন্ত্র কেনার পরিকল্পনা শুরু করেন তারা। বড় ভাই ও বন্ধু মাসুমকে বিনিয়োগকারী হিসেবে যুক্ত করে যন্ত্রাংশ কিনতে গিয়ে ১১ লাখ টাকা দাম জানতে পেরে আবারও হোঁচট খান। পরে নিজেদের মেধা কাজে লাগিয়ে ইন্টারনেটে বিভিন্ন তথ্য ঘেঁটে প্রায় পাঁচ লাখ টাকায় নিজেরাই তৈরি করেন সেই যন্ত্র।

পরে মেশিনটি বাসায় এনে ঈদের দিন টমেটো দিয়ে প্রথমবার পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হয়। এরপর চলতি বছরের ৯ জুন প্রথম তারা আম নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং ৭ জুলাই আন্তর্জাতিক মানের, অর্থাৎ থাই মানের ড্রাই ম্যাঙ্গো তৈরি করতে সক্ষম হন। পরে ড্রাই ম্যাঙ্গোর পাশাপাশি প্রিমিয়াম মানের ম্যাঙ্গো লেদার, পাকা আমের সস ও পাকা আমের পাউডার তৈরি শুরু করেন তারা।

উদ্যোক্তা মাইনুল ইসলাম জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ মানেই আমের দেশ। আমের মৌসুমে রসালো ফলের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ আমের খোসা ফেলে দেওয়া হয়। সেই খোসাকেই কাজে লাগিয়ে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে আমের খোসা প্রক্রিয়াজাত করে চা তৈরি করছেন তারা। এর নাম দিয়েছেন ‘ম্যাংগো পিলটি’।

ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ফেলে দেওয়া একটি উপাদানকে নতুন পণ্যে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন উল্লেখ করে মাইনুল জানান, শুধু নামেই নয়, স্বাদেও রয়েছে ভিন্নতা। তার দাবি, এই চায়ে পাওয়া যায় আমের স্বাদ ও ঘ্রাণের বিশেষ অনুভূতি। এতে বিশেষ পুষ্টিগুণও রয়েছে। অল্প পরিসরে উৎপাদন করে এরই মধ্যে বাজারজাত শুরু করেছেন তারা।

উদ্যোক্তা মিঠুন জানান, আম প্রক্রিয়াজাত করতে গিয়ে তারা খেয়াল করেন, আমের খোসা ছাড়ানোর সময় আমের একটি অংশ নষ্ট হচ্ছে। সেখান থেকেই তাদের মাথায় আসে আমের খোসা দিয়ে চা তৈরির পরিকল্পনা। তাদের নিরলস পরিশ্রমের পাশাপাশি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এবং আম গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরফ উদ্দিনের অবদানের কারণেই তারা এত কিছু করতে সক্ষম হয়েছেন।

নতুন উদ্যোক্তা হতে যারা আগ্রহী, তাদের প্রতি তার পরামর্শ, হতাশ না হয়ে বা চাকরির পেছনে না ছুটে আমকে কাজে লাগিয়েও অনেক কিছু করা সম্ভব।

অপর উদ্যোক্তা মাসুম আলী জানান, চীনের ১১ লাখ টাকার হিটার মেশিনের ওপর নির্ভর না করে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং নিজেদের মেধা কাজে লাগিয়ে স্থানীয়ভাবে অর্ধেক দামে যন্ত্রটি তৈরি করেছেন তারা। তাদের তৈরি যন্ত্রটিতে আমদানি করা মেশিনের চেয়ে চমৎকার স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া রয়েছে।

তাদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও বাজারসংযোগ পেলে ‘ম্যাংগো পিলটি’ সম্ভাবনাময় একটি স্থানীয় পণ্য হয়ে উঠতে পারে। তবে অর্থের অভাবে বড় পরিসরে উৎপাদন ও বাজারজাত করতে পারছেন না তারা। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে রপ্তানি করতে না পারলেও স্থানীয় চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে রপ্তানি করা সম্ভব বলে জানান তিনি।

সাধারণত এক মণ (৪০ কেজি) আম থেকে খোসা ছাড়ালে প্রায় ১৫ কেজি খোসা পাওয়া যায়। যা প্রক্রিয়াজাত করে এক কেজি ‘ম্যাংগো পিলটি’ উৎপাদন করা হয়। এই চা তারা স্থানীয় বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি দুই থেকে চার হাজার টাকা দরে বিক্রি করছেন।

এদিকে ভোলাহাটের প্রত্যন্ত এলাকায় আমের খোসার চায়ের নাম শুনেই ক্রেতাদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। কেউ প্রথমবার স্বাদ নিচ্ছেন, কেউ আবার প্রচলিত চায়ের সঙ্গে এর পার্থক্য মিলিয়ে দেখছেন। স্থানীয় চায়ের দোকানিদের মধ্যেও তৈরি হচ্ছে আগ্রহ।

চায়ের দোকানি আব্দুল আলিম জানান, যারা আমের চা পান করছেন, তারা আর অন্য চা খেতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। স্থানীয়ভাবে তৈরি হওয়ায় এবং দাম সাশ্রয়ী হওয়ায় তারাও লাভবান হচ্ছেন।

সাবেক এক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ জানান, তিনি প্রতিদিন অন্তত এক কাপ আমের চা পান করেন। তার মনে হয়, যেন আম খাচ্ছেন। কৃষি বিভাগও এ চায়ের পুষ্টিগুণ থাকার বিষয়টি জানিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাই নিয়মিত এ চা পান করেন। চায়ের ঘ্রাণ ও স্বাদ চমৎকার।

ভোলাহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সুলতান আলী বলেন, ভোলাহাটের স্থানীয় তিন যুবক আম থেকে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি ফেলে দেওয়া খোসাকে কাজে লাগিয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এসব আমজাত পণ্য ও ‘ম্যাংগো পিলটি’ বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. মোমিনুল হক বলেন, আমের মতো স্থানীয় কৃষিপণ্যের উপজাতকে কাজে লাগিয়ে নতুন পণ্য তৈরি হলে অপচয় কমানোর পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ফেলে দেওয়া আমের খোসা থেকে নতুন পণ্য তৈরির এই উদ্যোগ শুধু ভিন্ন স্বাদের চায়ের গল্প নয়, এটি স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার ও উদ্যোক্তা হওয়ার নতুন প্রচেষ্টারও গল্প।

তিনি এ উদ্যোগে সার্বিক সহায়তার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে এই চা রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব বলেও জানান এই বিপণন কর্মকর্তা।

বিএন

শেয়ার করুন

এখনই

আরো পড়ুন