কাজী ফার্মস লিমিটেডের ৯ লাখ টাকা মূল্যের ২১ হাজার ৬৯০ কেজি ভুট্টাবোঝাই উধাও হওয়া ট্রাকটি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হলেও মূল রহস্য এখনও কাটেনি। ঘটনার প্রাথমিক বিবরণ অনুযায়ী আলমডাঙ্গা থেকে উদ্ধার অভিযান, অভিযুক্তদের নাম-পরিচয় এবং এজাহারের একাধিক কপিতে আসামীদের নাম ও তথ্যের বারবার পরিবর্তন পুরো বিষয়টিকে নাটকীয় মোড় দিয়েছে।
মালামাল উদ্ধার হলেও আসামীরা পলাতক থাকায় এবং মালিকপক্ষের রহস্যজনক দাবির মুখে প্রশ্ন উঠেছে,এটি কি শুধুই চালকের প্রতারণা, নাকি নেপথ্যে রয়েছে কোনো প্রভাবশালী চক্রের যোগসাজশ?
কাজী ফার্মস লিমিটেডের দর্শনা এলাকার শস্য ক্রয় প্রতিনিধি মো: ইকবাল কবির জাহিদ (২৮) দায়ের করা এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১২ আগস্ট থেকে পর্যায়ক্রমে ভোলার ঘোষঘাটস্থ কাজী ফার্মসের ইউনিটে ভুট্টা পাঠানো হচ্ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১০ সেপ্টেম্বর তারিখে দর্শনার সি অ্যান্ড এফ ব্যবসায়ী মো: রফিকুল ইসলামের মালিকানাধীন একটি ট্রাক (রেজি নং: যশোর-ট-১১-৩৫৩৪) ভাড়া করা হয়।

উক্ত ট্রাকে ২১ হাজার ৬৯০ কেজি ভুট্টা (যার বাজারমূল্য ৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা) লোড করা হয়। ট্রাকটির চালক ছিলেন পরকৃষ্ণপুর গ্রামের আশরাফ হোসেনের ছেলে মো: মহিবুল ইসলাম (৩২) এবং হেলপার হিসেবে ছিলেন একই গ্রামের আলফাজ হোসেনের ছেলে মো: আল-আমিন হোসেন ওরফে পিয়াস (২৫)।
এজাহার অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর রাতে ভোলার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা থাকলেও চালক দুই দিন ধরে ট্রাকটি রামনগর মোড়ে ফেলে রাখেন। পরবর্তীতে ১৩ সেপ্টেম্বর সকালে হেলপারকে রেখে চালক একাই গাড়ি নিয়ে ভোলার উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলেও ভুট্টা ভোলায় না পৌছানোয় এবং চালক মহিবুলের মোবাইল নম্বর (০১৭২০-৪৮৮৬২৫) বন্ধ থাকায় সন্দেহ দানা বাধে।
অভিযোগকারী জাহিদ চালকের সন্ধানে ট্রাকমালিক রফিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করলে, ট্রাকমালিকের ম্যানেজার জানান যে, চালক মহিবুল গত ১৪ সেপ্টেম্বরই তাদের কাছে ফিরে এসে গাড়ি ভাড়ার সমস্ত হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেছেন।
অভিযোগকারীর দাবি, ১৩ সেপ্টেম্বর দর্শনা থেকে রওনা হয়ে একদিনের মধ্যে (১৪ সেপ্টেম্বর) ভোলায় মালামাল নামিয়ে পুনরায় দর্শনায় ফিরে এসে হিসাব বুঝিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই বাস্তবে সম্ভব নয়। এতে স্পষ্ট হয় যে, চালক মহিবুল ও তার সহযোগীরা অসৎ উদ্দেশ্যে মালামাল গন্তব্যে না নিয়ে পথিমধ্যে তা বিক্রি বা গায়েব করার পায়তারা করেছিল। ভুট্টা ও অগ্রিম গাড়িভাড়া ৩২ হাজার টাকাসহ সর্বমোট ৯ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
আলমডাঙ্গা থেকে ভুট্টাবোঝাই ট্রাক উদ্ধার ও তথ্যের অসঙ্গতি
পরবর্তীতে পুলিশ ও কোম্পানীর প্রতিনিধির গোপন অনুসন্ধানে তথ্য মেলে, উধাও হওয়া ট্রাকটি ভোলায় না গিয়ে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থানার এলাকাধীন একটি নির্জন স্থানে রাখা রয়েছে। পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে আলমডাঙ্গা এলাকা থেকে ভুট্টাবোঝাই ট্রাকটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। তবে অভিযানের টের পেয়ে আসামীরা কৌশলে পালিয়ে যায়।
এদিকে ঘটনার পর থেকে এলাকা ও প্রশাসনিক সূত্রে নানা অসঙ্গতি ও ভিন্ন তথ্য উঠে আসছে। ঘটনার খসড়া অভিযোগে আলমডাঙ্গা কেন্দ্রিক অন্য আসামী ও ভিন্ন গাড়ির নম্বরের কথা বলা হলেও, চূড়ান্ত এজাহারে সুনির্দিষ্টভাবে মহিবুল ও পিয়াসকে আসামী করা হয়েছে। অভিযোগকারীর নাম থেকে শুরু করে আসামী ও গাড়ির নম্বরের এই রদবদল এবং উদ্ধার প্রক্রিয়া নিয়ে স্থানীয়দের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম হয়েছে।

অন্যদিকে, ট্রাক মালিকপক্ষের দাবিকৃতরা চালকের থেকে হিসাব পাওয়ার পর গাড়িটি অন্য ড্রাইভার দিয়ে নতুন ট্রিপে পাঠান। মালামাল না পৌছানোর খবর পাওয়ার পর থেকে তারা অভিযুক্ত চালক মহিবুলের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে দর্শনা থানার ওসি নজরুল ইসলাম জানান, ভুক্তভোগী প্রতিনিধি ইকবাল কবির জাহিডের পক্ষ থেকে লিখিত এজাহার গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশের তৎপরতায় উধাও হওয়া ভুট্টাবোঝাই ট্রাকটি আলমডাঙ্গা থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ঘটনার পেছনের মূল রহস্য উন্মোচন এবং আত্মসাতের চেষ্টার সাথে জড়িত পলাতক আসামীদের গ্রেফতার করতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে আলমডাঙ্গা থেকে ৯ লক্ষ টাকা টাকার সম্পদ উদ্ধার হলেও, এজাহারের নানা পরিবর্তন এবং মূল আসামী গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত উধাও নাটকের আসল জট খুলছে না বলেই মনে করছেন সচেতন মহল।
এমএস/এএস



