দর্শনা কাজী ফার্মস লিমিটেডের ভুট্টা ক্রয়কেন্দ্র থেকে ভোলায় পাঠানো প্রায় ৯ লাখ টাকা মূল্যের ভুট্টা গন্তব্যে পৌছায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ২১ হাজার ৬৯০ কেজি ভুট্টাবোঝাই ট্রাকটি নির্ধারিত গন্তব্যে না পৌছে মাঝপথে মালামাল বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রতিষ্ঠানটির দর্শনা প্রতিনিধি মো. ইকবাল কবির জাহিদ। এ ঘটনায় ট্রাকচালক ও ট্রাকমালিকের বিরুদ্ধে দর্শনা থানায় লিখিত অভিগোগ দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, ট্রাকমালিকপক্ষের দাবি, চালক ১৪ সেপ্টেম্বর তাদের কাছে ফিরে এসে গাড়ির ভাড়ার হিসাব বুঝিয়ে দিয়েছেন। তবে মালামাল গন্তব্যে না পৌছানোর বিষয়টি জানার পর চালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ট্রাকমালিক সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী রফিকুলের ছেলে মো. রিফাত। ফলে ট্রাকের হিসাব বুঝিয়ে দেওয়ার পরও ভুট্টাবোঝাই গাড়ির মালামাল কোথায় গেল, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।
এজাহার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটি শুধু একটি ট্রাকের মালামাল গন্তব্যে না পৌছানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পরিবহনব্যবস্থা, চালকের দায়িত্ব এবং ট্রাকমালিকপক্ষের ভূমিকা নিয়েও তদন্তের অবকাশ রয়েছে।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর দর্শনা থানায় দেয়া অভিযোগে ইকবাল কবির জাহিদ উল্লেখ করেন, তিনি কাজী ফার্মস লিমিটেডের দর্শনা এলাকার ভুট্টা ক্রয়কেন্দ্রের প্রতিনিধি। কোম্পানির নির্দেশে গত ১২ আগস্ট থেকে পর্যায়ক্রমে ভোলার ঘোষঘাটে অবস্থিত কাজী ফার্মসের নির্ধারিত ইউনিটে ভুট্টা পাঠানো হচ্ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ১০ সেপ্টেম্বর ট্রাকমালিক মো. রফিকুল ইসলামের পরিবহন প্রতিষ্ঠানের একটি ট্রাক ভাড়া করা হয়। ট্রাকটির নিবন্ধন নম্বর যশোর-ট-১১-৩৫৩৪। এজাহার অনুযায়ী, ট্রাকটির চালক ছিলেন মো. মহিবুল ইসলাম।
ওই দিন বিকেল ৩টা ২৪ মিনিট থেকে রাত ৮টা ৩১ মিনিট পর্যন্ত দর্শনা থানাধীন করিমপুরে অবস্থিত নিজস্ব গুদাম থেকে ট্রাকে ভুট্টা তোলা হয়। এজাহারে ভুট্টার পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ২১ হাজার ৬৯০ কেজি এবং মূল্য ৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। লেবারদের মাধ্যমে ভুট্টা তোলার সময় চালক উপস্থিত ছিলেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, ১০ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ৯টার দিকে চালকের ভোলার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চালক দুই দিন ধরে ট্রাকটি রামনগর মোড়ে ফেলে রাখেন। পরে ১৩ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে হেলপারকে রেখেই একা ভোলার উদ্দেশে রওনা হন। ট্রাকটি দুই দিনের মধ্যে ভোলার নির্ধারিত গন্তব্যে পৌছানোর কথা ছিল। কিন্তু কয়েক দিন পার হলেও সেখানে ভুট্টা পৌছায়নি। চালকের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে বিভিন্ন স্থানে খোজাখুজি করেও চালক ও ট্রাকের সন্ধান পাননি বলে এজাহারে উল্লেখ করেছেন তিনি।
এজাহারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠেছে ট্রাকমালিকপক্ষের বক্তব্য ঘিরে। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, ১৭ সেপ্টেম্বর ট্রাকমালিক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, তার চালক ১৪ সেপ্টেম্বর ফিরে এসে ট্রাকের ভাড়ার হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেছেন।
ইকবাল কবির জাহিদের বক্তব্য, ১৩ সেপ্টেম্বর দর্শনা থেকে ভুট্টাবোঝাই ট্রাক নিয়ে ভোলার উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর মাত্র এক দিনের মধ্যে ভোলা থেকে ফিরে এসে ১৪ সেপ্টেম্বর ট্রাকমালিকের কাছে হিসাব বুঝিয়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তার অভিযোগ, চালক নির্ধারিত গন্তব্যে না গিয়ে অন্য কোথাও ভুট্টা বিক্রি করে দিয়েছেন এবং সেই অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। তবে চালক আদৌ ভোলায় গিয়েছিলেন কি না, ট্রাকটি কোন পথে চলাচল করেছে, কোথায় অবস্থান করেছে কিংবা ভুট্টা অন্য কোথাও বিক্রি হয়েছে কি না,এসব বিষয়ে জানাযায়নি।
ট্রাকমালিক রফিকুল ইসলামের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তার ছেলে মো. রিফাত ফোনে জানান, চালক গত ১০ তারিখে ভোলা থেকে ঢাকার উদ্দেশে ভুট্টা পরিবহনের একটি ট্রিপ ধরেছিলেন। দুই দিনের মধ্যে, অর্থাৎ ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে গাড়িটির গন্তব্যে পৌছানোর কথা থাকলেও সেটি সময়মতো পৌছায়নি। চালক ১৪ সেপ্টেম্বর ফিরে এসে তাদের কাছে হিসাব বুঝিয়ে দেন। এরপর অন্য একজন চালক দিয়ে ট্রাকটিকে নতুন ট্রিপে পাঠানো হয়।
তিনি আরও বলেন, ট্রিপ শুরুর সাত দিন পর শুক্রবার মোমিন মিয়ার ছেলে এসে তাদের জানান, এত দিনেও মালামাল গন্তব্যে পৌছায়নি। বিষয়টি জানার পর তারা আগের চালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু চালক ফোন রিসিভ করছেন না।
অভিযোগকারীর এজাহার অনুযায়ী, গন্তব্যে না পৌছানো ভুট্টার মূল্য ৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। এর সঙ্গে অগ্রিম গাড়িভাড়া ৩২ হাজার টাকা যোগ করে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাবি করা হয়েছে ৯ লাখ টাকা।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রাকমালিক রফিকুল ইসলাম মেসার্স এম আর ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী। তার বিরুদ্ধে চালকের সঙ্গে যোগসাজশে মালামাল ও গাড়িভাড়ার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনেছেন ইকবাল কবির জাহিদ। তবে ট্রাকমালিকপক্ষের ছেলে জানিয়েছেন, চালক ফিরে এসে হিসাব বুঝিয়ে দেওয়ার পর তারা নতুন চালক দিয়ে গাড়ি পাঠিয়েছেন।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন একটাই দর্শনার গুদাম থেকে ভোলার উদ্দেশে যাত্রা করা প্রায় ৯ লাখ টাকার ভুট্টাবোঝাই ট্রাকটি কোথায় গেল? চালক যদি সত্যিই ১৪ সেপ্টেম্বর ফিরে এসে ট্রাকমালিকপক্ষকে হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে থাকেন, তাহলে সেই সময় ট্রাকের মালামাল কোথায় ছিল? আর যদি ভুট্টা গন্তব্যে না পৌছে থাকে, তাহলে পরিবহন হিসাবের সঙ্গে পণ্য পৌছানোর হিসাব মিলবে কীভাবে?
দর্শনা থানার ওসি নজরুল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে একটি অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মনিরুজ্জামান সুমন/এএস



