সাতক্ষীরা: উপকূলীয় দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক হৃদস্পন্দন হিসেবে পরিচিত ‘সাদা সোনা’ বা চিংড়ি শিল্প আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে। বৈশ্বিক বাজারে একসময় যার একক আধিপত্য ছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র কষাঘাতে সেই চিংড়ি শিল্প এখন ক্রমশ ছন্দ হারাচ্ছে।
খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় ঘেরগুলোতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, পানির স্বল্পতা এবং ভাইরাসের হানায় ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। ফলে গত দেড় দশকে দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এই খাতের রপ্তানি পরিমাণ কমেছে প্রায় ২২ দশমিক ৬১ শতাংশ।
মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তর, খুলনার প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, এক দশক আগেও যেখানে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম হাতিয়ার ছিল গলদা ও বাগদা, তা এখন ধারাবাহিক পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা জাপানের মতো উচ্চ চাহিদা সম্পন্ন বাজারে এখনো বাংলাদেশি চিংড়ির কদর থাকলেও জলবায়ুজনিত অভিঘাতে উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও মাঠপর্যায়ের চাষিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এ সংকটের মূলে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমুখী প্রভাব। নগরায়নের প্রভাবে প্রাকৃতিক জলাশয় সংকুচিত হওয়া, মিষ্টি পানির উৎস কমে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং লাগামহীন তাপমাত্রা—সব মিলিয়ে বিপর্যস্ত উপকূলের ঘেরগুলো।
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা এলাকার প্রবীণ চাষি হাসিবুর রহমান নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “আগেও গ্রীষ্মে রোদ হতো, কিন্তু এখনকার মতো এমন তীব্র তাপদাহ দেখিনি। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে পানির তাপমাত্রা এতো বেড়ে যায় যে পানিতে হাত দেওয়া যায় না। ঘেরে পানি থাকে মাত্র দুই-তিন ফুট। অতিরিক্ত গরমে পানি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে চিংড়ি মরে ভেসে ওঠে।”
সাতক্ষীরা তালা উপজেলার বড়বিলা গ্রামের মৎস্য চাষী আব্দুর রশিদ বলেন প্রথমত আমরা রেনু সংকটে ভোগী প্রতিবছর। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সময় মতন বৃষ্টির পানি না পাওয়া ও তাপমাত্রার বৃদ্ধি হওয়ার কারণে ঘেরের অধিকাংশ রেনুপনা ভাইরাসের শিকার হয়ে আমরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অথচ সরকারি ভাবে আমাদের দেখার কেউ নেই।
বিজ্ঞানীরা জানান, অগভীর ঘেরে সূর্যরশ্মি সরাসরি তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছানোর ফলে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। সাতক্ষীরা চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলামের মতে, “অক্সিজেনের ঘাটতি এবং তীব্র তাপদাহের ফলে চিংড়ি ‘থার্মাল স্ট্রোক’ বা তাপজনিত চাপে পড়ে। এতে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায় এবং সহজেই বিভিন্ন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মড়ক দেখা দেয়।”
দেড় দশকের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় খুলনা অঞ্চলের (সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট) ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত রপ্তানির তথ্য পর্যালোচনা করলে এক উত্থান-পতনের করুণ চিত্র ফুটে ওঠেএসেছে।
স্বর্ণযুগ (২০১১-১২):
২০১১-১২ অর্থবছরে এই অঞ্চল থেকে সর্বোচ্চ ৪২,৪৮৯ মেট্রিক টন চিংড়ি রপ্তানি হয়, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ২,৫৩৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। কিন্তু (২০১২-২০১৪): পরের বছরই রপ্তানি কমে দাঁড়ায় ৩৮,৭২১ মেট্রিক টনে। তবে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি থাকায় উৎপাদন কমলেও (৩২,৮০২ টন) আয় হয়েছিল রেকর্ড ২,৭০০ কোটি ২২ লাখ টাকা।
সংকট ও মহামারী কাল (২০২০-২০২৪):
বৈশ্বিক মহামারী ও প্রতিকূল আবহাওয়ার ধাক্কায় ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি ৩৩,৫২৭ টনে নেমে আসে। এর পর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ২৫,১১৬ মেট্রিক টন চিংড়ি রপ্তানি হয়।
এদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নাটকীয়ভাবে রপ্তানি বেড়ে ৩৪,৮৭৬ মেট্রিক টনে (মূল্য ৩,১০৯ কোটি টাকা) পৌঁছালেও, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (জুলাই-মে) তা আবারো কমে দাঁড়ায় ৩২,৮৮২ মেট্রিক টনে (মূল্য ২,৩১৫ কোটি টাকা)। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আয় কমেছে প্রায় ৭৯৩ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে সংকট উত্তরণের উপায় সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সনাতন পদ্ধতি আঁকড়ে ধরে রেখে এই শিল্পকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। উৎপাদন হ্রাস ও ঘন ঘন মড়কের কারণে কোটি কোটি টাকার পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন চাষিরা।
সেন্টার ফর কোস্টাল এনভায়রনমেন্ট কজারভেশনের (সিসিইসি) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ জাহাঙ্গীর হাসান মাসুম জানান, “জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব এখন আর রূপকথা নয়, এটি সরাসরি উপকূলীয় অর্থনীতিতে আঘাত হানছে। দ্রুত বৈজ্ঞানিক উপায়ে অভিযোজন ব্যবস্থা জোরদার না করলে এই খাতের ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকার হয়ে পড়বে।”
সংকট কাটাতে গবেষকদের অভিমত ব্যক্ত করে বলেন ঘেরের পানির গভীরতা অন্তত ৪ থেকে ৫ ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধি করে রাতের বেলা পানিতে অক্সিজেনের সরবরাহ ঠিক রাখতে অ্যারেটর (Aerator) ব্যবহার করা। নিয়মিত বিরতিতে পানির গুণাগুণ, যেমন—তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, পিএইচ (pH) ও অক্সিজেনের মাত্রা পরীক্ষা করা।
উপকূলজুড়ে আধুনিক ও জলবায়ু-সহনশীল চিংড়ি চাষ পদ্ধতির বিস্তার ঘটানো। দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এই চালিকাশক্তিকে বাঁচাতে এখনই সমন্বিত টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের পরিবেশবিদ এবং মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, এটি শুধুই কোনো একটি একক খাতের ক্ষতি নয়; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রূপসা ও উপকূলীয় অঞ্চলের সার্বিক অর্থনীতিতে কতটা মারাত্মক আঘাত হানছে—তারই সুস্পষ্ট প্রমাণ। দ্রুত সময়ে পরিবেশবান্ধব ও আধুিনক উপায়ে চিংড়ি চাষ পদ্ধতির (যেমন: সেমি-ইন্টেনসিভ পদ্ধতি) অভিযোজন নিশ্চিত করা না গেলে দেশের অন্যতম প্রধান এই রপ্তানি খাতটি অচিরেই অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।
আব্দুল মোমিন/এএস



