শনিবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১১ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১৫ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

এএসপির নির্দেশে ‘মাদক’ উদ্ধার অভিযানে নির্মূল কমিটির সদস্যরা, অভিযানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন  

এএসপির নির্দেশে ‘মাদক’ উদ্ধার অভিযানে নির্মূল কমিটির সদস্যরা, অভিযানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন  

মাদক পাচারের অন্যতম নিরাপদ রুট হিসেবে পরিচিত সীমান্তবর্তী চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলা। স্থানীয়দের কাছে মাদকের স্বর্গরাজ্য হসেবেও বিবেচিত এলাকাটি। সম্প্রতি মরণব্যাধি এই মাদকের অতি বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গঠণ করে মাদক নির্মূল কমিটি। এই কমিটির মূল কাজ হলো সন্দেহভাজন মাদক বিক্রেতার গতিবিধি বা মাদক সেবন-বেচাকেনার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো।

তবে এবার মাদক নির্মূল কমিটির সদস্যরা সরাসরি মাদক উদ্ধার অভিযানে নেমেছেন। একদিকে মাদক নির্মূল কমিটির সদস্যদের এমন অভিযানের বৈধতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে অন্যদিকে মাদক উদ্ধারের পর তা আত্মসাৎ, আটকের ঘটনা গোপন রেখে অর্থ আদায় এবং জব্দ করা মাদকের প্রকৃত পরিমাণ কম দেখিয়ে থানা পুলিশকে জানানোর বিষয়টিও সামনে এসেছে।

জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার দর্শনা থানা এলাকা থেকে জীবননগর থানার মানিকপুর গ্রামে গ্রামে গিয়ে কমিটির সদস্যরা অভিযান চালিয়েছেন। অভিযানের বিষয়টি স্বীকার করে আকন্দবাড়িয়া গ্রামের মাদক নির্মূল কমিটির সভাপতি আব্দুল মুন্নাফ বলেন,সার্কেল এএসপির নির্দেশে তিনিসহ ৭-৮ জন জীবননগর উপজেলার মানিকপুর গ্রামে যান। সেখানে রাজা নামের এক ব্যক্তিকে ধরতে তারা অভিযান চালান।

তবে মাদক উদ্ধার অভিযানের বৈধতা নিয়ে জানতে চাইলে মুন্নাফ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ফোনে এনটিভি অনলাইনের সাংবাদিক রিপন হসেনকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানালে মুন্নাফ ওই সাংবাদিক রিপন হোসেনের কাছে ক্ষমা চান।

মানিকপুর গ্রামে মাদক নির্মূল কমিটির সদস্যদের অভিযান সম্পর্কে জানতে চাইলে জীবননগর-দামুড়হুদা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার নুরুল্লাহ বলেন, আইনত মাদক নির্মূল কমিটির সদস্যরা এটা করতে পারেন না।

মাদক নির্মূল কমিটির সভাপতি আব্দুল মুন্নাফের দাবী সার্কেল এএসপির নির্দেশেই অভিযান চালিয়েছেন তিনি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি ওরকম কোনো নির্দেশ দিয়নি। তাছাড়া এরকম নির্দেশ দেয়ার আইনগত কোনো সুযোগ নেই।

তাহলে মাদক নির্মূল কমিটির সভাপতি আব্দুল মুন্নাফ অভিযান চালানোর নির্দেশ আপনি দিয়েছেন এটা কেন বললেন এই প্রশ্নের জবাবে সহকারী পুলিশ সুপার জানান, বিষয়টি যিনি বলেছেন তিনিই বলতে পারবেন। যদি এরকম কিছু হয়ে থাকে সেটা তদন্ত করা হবে।

আইন কী বলছে
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ধারা ২৩ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পুলিশের উপপরিদর্শক বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা, নির্দিষ্ট পর্যায়ের কাস্টমস কর্মকর্তা, বিজিবির ল্যান্স নায়েক বা তদূর্ধ্ব এবং কোস্ট গার্ডের নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মকর্তারা মাদক অপরাধের বিষয়ে আইনানুগ শর্তসাপেক্ষে পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন।

একই আইনের ধারা ২১-এও ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রকাশ্য স্থান বা চলন্ত যানবাহনে মাদকদ্রব্য তল্লাশি, জব্দ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আটক বা গ্রেপ্তারের বিধান রয়েছে। আর ধারা ২২-এ তল্লাশি, গ্রেপ্তার, জব্দ ও আটকের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির বিধান অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।

ফলে স্থানীয়ভাবে গঠিত কোনো মাদক নির্মূল কমিটির সদস্যরা নিজেদের উদ্যোগে অন্য থানা এলাকায় গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো তল্লাশি, আটক বা জব্দের কার্যক্রম চালাতে পারেন কি না—এ নিয়ে আইনগত প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়া যদি মাদক নির্মূল কমিটির সদস্যরা এরকম অভিযান চালানো শুরু করে তাহলে হিতে বিপরীত হতে পারে। এতে করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও নানা প্রশ্নের সম্মুখিন হবে। একইসাথে মাদক উদ্ধারের পর তা আত্মসাৎ হচ্ছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে সেটার সত্যতাও নিশিচ হবে। ফলে এখনই লাগাম টানতে হবে এসবের।

এর আগে মাদক উদ্ধারের পর তা আত্মসাৎ, আটকের ঘটনা গোপন রেখে অর্থ আদায় এবং জব্দ করা মাদকের প্রকৃত পরিমাণ কম দেখিয়ে মামলা করার অভিযোগে ওই মাদক নির্মূল কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে।

জানা যায়, গত ১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার দুপুরে আকন্দবাড়িয়া স্কুল এলাকা থেকে বিকাশ (৩০) নামে এক যুবকের মোটরসাইকেলটির গতিরোধ করে তল্লাশি চালিয়ে ১৩২ বোতল ভারতীয় নিষিদ্ধ নেশাজাতীয় স্কাফ সিরাপ উদ্ধার করে
ওই মাদক নির্মূল কমিটির সদস্য জসিম, জুয়েল, রিপন ও রকিসসহ আরও কয়েকজন।

বিকাশের দাবি, তল্লাশির পর তার মোটরসাইকেল ও স্কাফ সিরাপগুলো নিয়ে নেওয়া হয়। এরপর মোটরসাইকেলটি ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে তার কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া এবং তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান বিকাশ।

ঘটনার পর বিষয়টি সামনে আসে বিকাশের দুলাভাই রাজাকে ফোন করার মধ্যদিয়ে। রাজা অভিযোগ করেন, জসিম তাকে ফোন করে বিকাশকে মাদকসহ আটকের কথা জানান। একই সঙ্গে মোটরসাইকেলটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে তিনি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা পাঠান। এ লেনদেনের তথ্য-প্রমাণ তার কাছে রয়েছে।

কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, টাকা দেওয়ার পরও বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়নি। রাজা অভিযোগ করেন, বিকাশের মোটরসাইকেলে থাকা ১৩২ বোতল স্কাফ সিরাপের মধ্যে ৩৫ পিস পুলিশকে উদ্ধারের কথা জানানো হয়। সঙ্গে উদ্ধার দেখানো হয় মোটরসাইকেলটি।

অর্থাৎ অভিযোগকারীর দাবি অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে থাকা মাদকের পরিমাণ এবং পরে মামলায় দেখানো উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য নিয়েই এখন উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- আটকের সময় প্রকৃতপক্ষে কত বোতল মাদক ছিল?

যদি ১৩২ বোতল থাকে, তাহলে বাকি মাদকের কী হয়েছে? আর যদি ৩৫ বোতলই উদ্ধার হয়ে থাকে, তাহলে ১৩২ বোতলের দাবি কতটা সত্য? এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগও।

রাজা আরও অভিযোগ করেন, জসিম, জুয়েল, রিপন ও রকিসসহ কয়েকজন ‘মাদক নির্মূল কমিটি’র নাম ব্যবহার করে মাদক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে মাদক সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। মাদক উদ্ধারের পর সেটি যথাযথভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের পরিবর্তে নিজেদের মধ্যে রেখে দেওয়ার পাশাপাশি আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে।

দর্শনা থানার ওসি নজরুল ইসলাম বলেন, গত ১৯ সেপ্টেম্বর আকন্দবাড়িয়া এলাকা থেকে ৩৫ বোতল স্কাফ সিরাপ ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে কোনো আসামি পাওয়া যায়নি এ ঘটনায় দর্শনা থানায় একটি মামলা হয়েছে।

এএস

শেয়ার করুন

এখনই

আরো পড়ুন