বয়স একশ পনেরো বছর। এই বয়সে যেখানে মানুষের ঠাঁই হওয়ার কথা সন্তানের কোলে, নাতি-নাতনির আদরে— সেখানে একটা মানুষ প্রতিদিন ভোরবেলা সাইকেলের প্যাডেলে পা রাখেন, শুধু একমুঠো ভাতের আশায়। স্ত্রী নেই বহু বছর, সন্তানরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। শরীরে রোগ বাসা বেঁধেছে, তবুও থামার উপায় নেই। এভাবেই চলছে চুয়াডাঙ্গার কবিখালী গ্রামের আব্দুল বারীর জীবনযুদ্ধের গল্প।
ভোরের সূর্য তখনও পুরোপুরি আকাশ ফুড়ে বের হয়নি। ঠিক এই সময়েই বিছানা ছাড়তে হয় আব্দুল বারীকে। কারণ পেটের ক্ষুধা জানে না বয়সের হিসাব। একশ পনেরো বছরের ভারে নুয়ে পড়া শরীর নিয়েই সাইকেলে চেপে বসেন একমুঠো ভাতের সন্ধানে জীবিকার তাগিদে। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে বেড়ান হাঁড়ি-পাতিলের হাতল লাগানোর কাজে। শরীর সাড়া দেয় না ঠিকমতো, তবুও থেমে থাকার উপায় নেই তাঁর।
আব্দুল বারী জানান, স্ত্রী মারা গেছেন বহু আগে। সেদিন থেকেই সম্পূর্ণ একা তিনি। বয়স হয়েছে, শরীরে নানান কষ্ট আছে। তবুও পেটে ক্ষুধা লাগলে বসে থাকা যায় না। কাজ করলে তবেই তো খাবার জোটে। নিজের রান্না, নিজের বাসন—সবই নিজেকে করতে হয়। কাজ করলে তবেই আগুন জ্বলে চুলায়। কাজ না হলে কোনোদিন পানিও গরম হয় না।

তিনি আরও বলেন, দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন, স্বপ্ন দেখেছিলেন বার্ধক্যে হয়তো একটু আশ্রয় মিলবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো উল্টো— মেয়েরা আজ আর খোঁজ রাখে না বাবার। ছেলে সন্তান নেই যে হাত ধরে বলবে, বাবা, আর কষ্ট করতে হবে না। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে সন্তানরাও আর খোঁজ নেয় না। একা হয়ে গেছি সম্পূর্ণ।
আব্দুল বারী যে ঘরে থাকেন, সেটাকে ঘর বলাও কঠিন। টিনের চালে অসংখ্য ফুটো। বৃষ্টি এলেই আকাশ যেন নেমে আসে ঘরের ভেতরেই। মেঝে ভিজে যায়, বিছানা ভিজে যায়। সেই স্যাঁতসেঁতে ঘরেই একা রাত কাটাতে হয় তাঁকে।
তাঁর পৈতৃক বাড়ি কুষ্টিয়ার হালসা কুসা মল্লিকপুরে। বাবা মৃত তাসের মল্লিক। বিয়ের পর ঘরজামাই হিসেবে কবিখালীতে থিতু হন তিনি, শ্বশুরের জমিতেই আজও দাঁড়িয়ে আছে তাঁর এই ভাঙা আশ্রয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ফজর আলী বলেন, আমরা জন্মের পর থেকেই দেখছি এই মানুষটাকে এভাবে সংগ্রাম করতে। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন তিনি, কিন্তু কখনো হাল ছাড়েননি।
একশ পনেরো বছরের এই জীবনযুদ্ধ শুধু একটা মানুষের গল্প নয়— এটা আমাদের সমাজের কাছে একটা প্রশ্ন। পেটের দায়ে রোগ-শোক সঙ্গী করেই ছুটে চলেন তিনি প্রতিদিন, শুধু একমুঠো ভাতের আশায়। যে বয়সে বিশ্রাম প্রাপ্য ছিল তাঁর, সেই বয়সেও ভিজে যাওয়া ঝুপড়ি ঘরে একা রাত কাটাতে হয় তাঁকে। প্রশ্ন থেকে যায়— এই মানুষটার পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব কার?
এ,আর,ডাবলু/এএস



