চুয়াডাঙ্গায় আবারও বাড়তে শুরু করেছে হামের প্রকোপ। প্রতিদিনই নতুন করে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে শিশু। আক্রান্ত অনেকের শুরুতে ঠাণ্ডা-জ্বর ও নিউমোনিয়ার উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। পরবর্তীতে শরীরে হামের লক্ষণ ও লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিচ্ছে।
জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের ২২ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে ১৩০ শিশু। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি ছিল ২০ শিশু। প্রতিদিন গড়ে আরও চার থেকে পাঁচজন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছে।
জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত ৭১২ শিশু হাম নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। শুরুর দিকে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আটজন রোগী ভর্তি রয়েছে। শিশু ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যার বিপরীতে রোগীর সংখ্যা শতাধিক হওয়ায় অনেক শিশুকে মেঝে ও বারান্দায় রেখেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত বেডগুলোতে জায়গা না থাকায় মেঝে ও বারান্দাতেও শিশুদের রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। কোনো শিশু হামে আক্রান্ত, কেউ নিউমোনিয়ায়, আবার কেউ ঠাণ্ডা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দিনের পর দিন হাসপাতালে অবস্থান করছে।
একই সঙ্গে ওয়ার্ডের চারপাশের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও ময়লা-আবর্জনা নিয়ে রোগীর স্বজনদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা গেছে। তাদের আশঙ্কা, বিভিন্ন সংক্রমণে আক্রান্ত শিশুদের ভিড়ের মধ্যে হাসপাতালের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না থাকলে রোগের বিস্তার আরও বাড়তে পারে।
রোগীর স্বজনরা জানান, হামে আক্রান্ত অনেক শিশুর ক্ষেত্রেই প্রথমে ঠাণ্ডা-জ্বর ও নিউমোনিয়ার উপসর্গ দেখা দেয়। পরে শরীরে হামের লক্ষণ ও লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়।
হামে আক্রান্ত ছয় বছর বয়সী এক শিশুর মা বলেন, হামের শুরুতেই টিকা দিয়েছিলাম মেয়েকে। তারপর কয়েক মাস পর হামের উপসর্গ দেখা দেয়ায় সদর হাসপাতালে নিয়ে আসি। এখন চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসা ভালো পেলেও বেড না থাকায় মেঝেতে অবস্থান করতে হয়েছে।
আরেক শিশুর মা বলেন, প্রথমে আমার বাচ্চা মেয়ের ঠাণ্ডা-জ্বর আসে। এরপর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। তারপর আবার দেখি হামের উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। এখন সারা শরীরে হামের লালচে ফুসকুড়ি বেড়ে গেছে। তিন দিন ধরে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এখনো সুস্থ হয়নি।
অপর এক শিশুর স্বজন বলেন, আমার নাতির ঠাণ্ডা-কাশির পর নিউমোনিয়া হয়েছিল। তারপর শুরু হলো হাম। নিয়মিত হাসপাতালে ডাক্তার দেখছেন এবং চিকিৎসা দিচ্ছেন। কিন্তু হাসপাতালের পরিবেশ খুবই নোংরা। চারপাশে ময়লা-আবর্জনা ভর্তি। এর মধ্যে আবার বেড নেই। মেঝে-বারান্দায় বসে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
আরেক রোগীর স্বজন বলেন, শিশু ওয়ার্ডের চারপাশ অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন। এতে মশার উপদ্রব বাড়ছে। ফলে এই হামের মধ্যে ডেঙ্গু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২০ এপ্রিল জেলায় হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয় এবং তা ১০ মে পর্যন্ত চলে। জেলার চারটি উপজেলা ও চারটি পৌর এলাকার আটটি স্থায়ী কেন্দ্রসহ মোট ৯৮০টি কেন্দ্রে বিনামূল্যে জেলায় এক লাখ ৩০৫ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেয়া হয়।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত রোগীর চাপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর কাজের চাপ।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স বেবি আক্তার বলেন, হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার তুলনায় রোগী বেশি। মাত্র দুইজন নার্স দিয়ে সামলানো অসম্ভব অবস্থা। এর মধ্যেও রোগীসেবা অব্যাহত রেখেছি। টিকা নেয়ার পরও শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা দেখা যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ফারহানা ওয়াহিদ তানি বলেন, টিকা দেয়ার পর হামের প্রকোপ কম ছিল। মাঝে কম ছিল, আবার বাড়তে শুরু করেছে হাম। তবে আতঙ্ক হওয়ার কিছু নেই। নিয়মিত চিকিৎসা নিলে হাম থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।
এমভি/জেএন



