সোমবার, ১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৩০শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ৩রা রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

এইডসে আক্রান্তদের অর্ধেকই সমকামী

এইডসে আক্রান্তদের অর্ধেকই সমকামী

ঢাকা : বর্তমানে দেশে এইডসের চিকিৎসা নিচ্ছেন প্রায় সাড়ে আট হাজার জন। সাড়ে আট হাজার জনের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই সমকামী। আর সমকামী আক্রান্তদের ৮০ ভাগই শিক্ষার্থী। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেডিকেল সব পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা রয়েছেন এই তালিকায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির (এসটিডি) তথ্য ও মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে, পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুমেল (ছদ্মনাম)। বছর দুয়েক আগে ফেসবুকে স্ক্রল করতে গিয়ে সমকামীদের একটি গ্রুপ দেখতে পান। কৌতূহলবশত নিজেও যুক্ত হন। এক পর্যায়ে নিয়মিত হন সেই গ্রুপে। মাসখানেক যেতেই জড়িয়ে পড়েন সমকামিতায়। গত ২০ এপ্রিল তার এইচআইভি শনাক্ত হয়।

রুমেল বলেন, সমকামিতায় কীভাবে জড়িয়ে গেছি, বলা মুশকিল। আমি যে আক্রান্ত, সেটি পরিবার ও অনেক কাছের বন্ধুরাও জানে না। অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন। আক্রান্ত হওয়ার খবরে ভয় পাই। ওষুধ খাওয়া শুরু করেছি। কিন্তু রোগটা এমন যে, সামাজিকভাবে বলতেও পারছি না।

রুমেলের ১১ মাস আগে এইচআইভি শনাক্ত হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের পলিটেকনিক শিক্ষার্থী তয়ানভির (ছদ্মনাম)। ২২ বছরের এই তরুণও সমকামী। সম্প্রতি শারীরিক নানা জটিলতায় একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে তাকে। সর্বশেষ গত ১৯ এপ্রিল ভর্তি হন ঢাকার একটি হাসপাতালে। তবে এইডসে আক্রান্ত নিয়ে কিছু বলতে চাননি তিনি।

এসটিডির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সাল থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেশে এইডসে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৪ হাজার ৩১৩। এর মধ্যে মারা গেছেন দুই হাজার ৬৬৬ জন। চিকিৎসাধীন আট হাজার ৫০০ জন ভর্তি রয়েছেন ১৬টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালে।

অধিকাংশের বয়স ১০-২৪ বছর
এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কেন্দ্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সমকামী আক্রান্তদের ২১ শতাংশের বয়স ১০ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। ৩১ শতাংশের বয়স ২০ থেকে ২৪ বছর। বাকি ৪৮ শতাংশের বয়স ২৫ বছরের বেশি।

সমকামীদের বাইরে আক্রান্তদের মধ্যে সামরিক বাহিনীর সদস্যসহ নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষ আছেন, যাদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন বিদেশ ছিলেন।

দেশে সর্বোচ্চ এইচআইভি শনাক্ত হয় রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ)। গত বছর এই কেন্দ্রে ২৯৩ জনের এইডস শনাক্ত হয়েছিল।

চলতি বছর প্রতি মাসে ২০০ থেকে ২৫০টি পরীক্ষা হচ্ছে, যার মধ্যে ২৮ থেকে ৩০ জনের সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে। তাদের ৭০ শতাংশই সমকামী।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শনাক্তকরণ কেন্দ্র মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। রোগ নির্ণয়ের পাশাপাশি আক্রান্তদের চিকিৎসায় এখানে ২৫ শয্যার আলাদা ইউনিট রয়েছে। বর্তমানে ২২ জন চিকিৎসাধীন। প্রতিদিন ছয় থেকে ১০ জন এইডসের ক্ষত নিয়ে আসছেন।

২০২৫ সালে এই কেন্দ্রে দুই হাজার ৯২টি পরীক্ষায় এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে ২৭২ জনের। এর মধ্যে পুরুষ সমকামী ১১৭ জন, যাদের হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশই শিক্ষার্থী।

হাসপাতালের পরামর্শক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাবলেন, একসময় যৌনকর্মী ও মাদকসেবীদের মাঝে আক্রান্তের হার বেশি থাকলেও বর্তমানে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে সমকামীদের মাঝে। তাদের বড় অংশই শিক্ষার্থী, এটি উদ্বেগজনক।

তিন আরও বলেন, অনেকে হয়তো এখনও লক্ষণ নিয়ে গোপনে রয়েছেন। পরিবেশ না পাওয়ায় অনেকে বলার সাহস পান না। এমনকি কাছের মানুষদের সঙ্গেও আলোচনা করতে ভয় পান কেউ কেউ। কারণ, এইডসে আক্রান্ত জানলেই সামাজিকভাবে এক ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।

এই হাসপাতালেই গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নে আক্রান্তদের পরামর্শ দেন হরিপদ দাস। তিনি নিজেও এইচআইভিতে আক্রান্ত।

হরিপদ দাস বলেন, ‘এইচআইভিতে আক্রান্ত হলে অনেকে ভেঙে পড়ে, কেউ মনে করে আর বাঁচবে না। তখন মানসিকভাবে সাপোর্ট দেওয়াটাই আমার কাজ। অনেক সময় তারা কথা বলতে চায় না। আমি নিজেই আক্রান্ত বলে জানালে, তখন তারা নির্ভয়ে কথা বলে, বেঁচে থাকার সাহস পায়।’

ঢাকার বাইরেও একই চিত্র। যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল কেন্দ্রে সাড়ে তিন শতাধিক এইচআইভি রোগী নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে এক হাজার ২৪১ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছেন ১৮ জন। এর মধ্যে ১২ জনই সমকামী এবং তাদের মধ্যে আটজন শিক্ষার্থী।

কেন্দ্রটির পরামর্শক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, সমকামী মানেই যেন শিক্ষার্থী, পরিস্থিতি এমন অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা আসছেন, কীভাবে কি হলো সব শুনে যতটা পারি প্রতিরোধের উপায়গুলো বলে দিই।

তাছাড়া- চট্টগ্রাম, খুলনা, ঢাকা ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও শিক্ষার্থীদের আক্রান্তের হার প্রায় একই রকম।

জেপি/এনডি/এএস

শেয়ার করুন

এখনই

আরো পড়ুন