সোমবার, ১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৩০শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ৩রা রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

৩ মণ ধানে একটা ইলিশ, রূপালী সম্পদ নাগালের বাইরে

৩ মণ ধানে একটা ইলিশ, রূপালী সম্পদ নাগালের বাইরে

সাতক্ষীরা: বর্ষার মেঘলা আকাশ আর ধোঁয়া ওঠা ভাতের থালায় এক টুকরো ইলিশ—বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি ও আবেগের এক মূর্ত প্রতীক। কিন্তু কালক্রমে বাঙালির সেই আজন্ম লালিত আবেগ আর স্বাদের অভিজ্ঞতা ম্লান হতে বসেছে। দেশের নদ-নদী ও সাগরে ইলিশ মিললেও, তা সাধারণ, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের পাতে ওঠার জো নেই। লাগামহীন দামের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বাজারে গিয়ে প্রতিদিন হাহাকার করছেন সাধারণ ক্রেতারা। সাধ ও সাধ্যের চরম টানাপোড়েনে জাতীয় মাছ রূপালী ইলিশ আজ খেটে খাওয়া মানুষের কাছে এক অধরা স্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

​আকাশছোঁয়া বাজারদর: দিশেহারা ক্রেতা
সাতক্ষীরার প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র বড়বাজার মাছহাটা ও তালা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পাটকেলঘাটা বাজার ঘুরে দেখা গেছে—ছোট, মাঝারি কিংবা বড়—সব আকারের ইলিশের বাজারই চরম চড়া। মাঝারি সাইজ (৬০০ গ্রাম): প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকায়। ১ কেজি ওজনের ইলিশ: প্রতি কেজির দাম হাঁকা হচ্ছে ২৩০০ থেকে ২৫০০ টাকা। বড় সাইজ (১.৫ কেজি বা তদূর্ধ্ব): প্রতি কেজি বিকোচ্ছে ৩০০০ থেকে ৩২০০ টাকা পর্যন্ত।

বাজারের এমন অগ্নিমূল্যে চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন সাধারণ ক্রেতারা। সাতক্ষীরার বড় বাজারে মাছ কিনতে আসা পাটকেলঘাটার চাকরিজীবী হাবিবুর রহমান ক্ষোভ ও আক্ষেপ নিয়ে বলেন “ইলিশ মাছ এখন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য আকাশের চাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাত দিনের পুরো বেতন ঢেলে দিয়ে মাত্র একটা ইলিশ কিনতে হচ্ছে! একটি মাছের পেছনেই যদি আয়ের বড় একটা অংশ চলে যায়, তবে বাকি মাসজুড়ে পরিবার নিয়ে কী খেয়ে বাঁচব?”

পেশাজীবীদের মতো চরম বিপাকে পড়েছেন হাড়ভাঙা খাটুনিতে ফসল ফলানো কৃষকরাও। মাঠের ফসলের ন্যায্য দাম আর ইলিশের আকাশচুম্বী মূল্যের কোনো হিসাব মেলাতে পারছেন না তাঁরা।

তালা উপজেলার বড়বিলা গ্রামের কৃষক আব্দুর রশিদ আমিন নিজের করুণ অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে বলেন বাড়িতে ছেলে আর বৌমা ইলিশ মাছ খাওয়ার আবদার করেছিল। তাঁদের শখ মেটাতে হাটে কষ্টার্জিত ৩ মণ ধান বিক্রি করে পেয়েছিলাম ৩৩০০ টাকা। সেই টাকা নিয়ে বাজারে গিয়ে ১ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের একটি ইলিশ কিনতেই পুরো ৩৩ শত টাকা শেষ! তিন মণ ধান ফলানোর পেছনের ঘাম ও কষ্টের মূল্য আজ মাত্র একটি ইলিশের সমান। এভাবে চললে আমাদের মতো কৃষকদের আর কোনোদিন ইলিশ খাওয়ার সামর্থ্য থাকবে না।”

​স্বাদের ভাঁটাতেও চড়া দাম নিয়ে শিক্ষক আক্ষেপকরে বলেন শুধু আকাশছোঁয়া দামই নয়, ইলিশের সেই ঐতিহ্যবাহী আগের স্বাদ নিয়েও বড় আক্ষেপ রয়েছে ক্রেতাদের। চরমখালি গ্রামের স্কুলশিক্ষক মুজিবুর রহমান বলেন আগে ইলিশ মাছ ভাজলে বা রান্না করলে তার সুবাসে পাড়া-পড়শি টের পেত। নদীদূষণ ও প্রজনন পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার মতো নানা কারণে ইলিশের সেই আগের স্বাদ এখন আর পাওয়া যায় না। স্বাদের সেই সুদিন ফিরুক বা না ফিরুক, দাম কিন্তু প্রতিদিন হাতের নাগাল ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মাসের শেষে বেতন পেয়ে বাজারে গিয়ে একটা ইলিশ কিনলে সপ্তাহের অন্য বাজার করার সামর্থ্য থাকে না।”

​এদিকে ইলিশের এই চরম অগ্নিমূল্যের পেছনে বড় আড়তের বাড়তি দাম ও পরিবহন খরচকে দায়ী করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। পাটকেলঘাটা বাজারের প্রবীণ মৎস্য ব্যবসায়ী মস্ত জানান, চাঁদপুর (বড় স্টেশন মৎস্য আড়ৎ), বরিশাল (পোর্ট রোড আড়ৎ), ভোলার বিভিন্ন আড়ৎ, পটুয়াখালী-বরগুনার মহীপুর-পাথরঘাটা এবং চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ও ফিডার রোডের পাইকারি বাজার থেকেই চড়া দামে মাছ কিনতে হচ্ছে।

​ব্যবসায়ী মস্ত আরও বলেন উৎসব বা ভরা মৌসুমেও দেশের বড় বড় পাইকারি আড়তে ইলিশের দাম আকাশছোঁয়া। সেখানে চড়া দামে মাছ কিনে, আড়ৎদারি ও পরিবহন খরচ মিটিয়ে স্থানীয় বাজারে এনে বিক্রি করতে আমাদের নাভিশ্বাস উঠছে। আগের মতো লাভ তো দূরের কথা, বিক্রি কমে যাওয়ায় মাঝে মাঝে লোকসান গুনতে হচ্ছে। মাত্র ১৫ দিন আগেও চাঁদপুর আড়ৎ থেকে মাছ এনে ক্রেতা না পাওয়ায় আমাদের বড় অংকের ক্ষতি হয়েছে। তবুও ব্যবসার তাগিদে ও স্থানীয় মানুষকে ইলিশের স্বাদ দিতে ঝুঁকি নিয়ে মাছ আনছি।”

সংস্কৃতির অঙ্গনে অনিশ্চয়তার ছায়া
ইলিশ কেবল বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের অংশ নয়, এটি আমাদের জাতীয় পরিচয় ও লোক সংস্কৃতির অনবদ্য অনুষঙ্গ। কিন্তু সামগ্রিক নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি আর সাধারণ মানুষের আয়ের সাথে ইলিশের মূল্যের বিরাট ফারাক পরিবারগুলোর উৎসবের আনন্দকে ফিকে করে দিচ্ছে। দেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ হওয়া সত্ত্বেও রূপালী ইলিশ আজ জায়গা করে নিচ্ছে কেবল বিত্তশালীদের পাতে। বাজারে ইলিশের রূপালী ঝলক থাকলেও তা দেখে সাধারণ কৃষক ও খেটে খাওয়া মানুষের মুখে কেবলই দীর্ঘশ্বাস আর হতাশার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আব্দুল মোমিন/এএস

শেয়ার করুন

এখনই

আরো পড়ুন