রবিবার, ১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২রা রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

মা-ছেলের এসএসসিতে জিপিএ-৫, পরিবারে আনন্দের জোয়ার

মা-ছেলের এসএসসিতে জিপিএ-৫, পরিবারে আনন্দের জোয়ার

রাজশাহী: দীর্ঘ সময় পড়াশোনা থেকে দূরে থাকার পর নতুন করে শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন রাজশাহী নগরীর রাজপাড়া থানার বসিলা এলাকার বাসিন্দা সাদিয়া বেগম। ছেলের সঙ্গে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। সংসারের দায়িত্ব সামলে ছেলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চালিয়ে গেছেন নিজের পড়াশোনাও।

অবশেষে সেই অধ্যবসায়ের ফলও পেলেন। এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় মা পেয়েছেন জিপিএ-৫, আর ছেলে পেয়েছে গোল্ডেন জিপিএ-৫। মা-ছেলের এই সাফল্যে এখন আনন্দের জোয়ার বইছে পরিবার ও এলাকাজুড়ে।

প্রায় ১৯ বছর আগে বিয়ের পর তার পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। সংসার ও পারিবারিক নানা দায়িত্বের কারণে তখন বই-খাতা ছেড়ে দিতে হয় তাকে। দীর্ঘ সময় পড়াশোনার বাইরে থাকলেও শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ কখনো কমেনি। শেষ পর্যন্ত আবারও বই হাতে তুলে নেন সাদিয়া। নতুন করে শুরু করেন শিক্ষাজীবন।

দুই বছর আগে তিনি সিদ্ধান্ত নেন ছেলের সঙ্গে একই বছরে এসএসসি পরীক্ষা দেবেন। পরিবারের সম্মতিতে শুরু করেন পরীক্ষার প্রস্তুতি। সংসারের কাজের ফাঁকে নিয়মিত পড়াশোনা করেছেন। দুই ছেলের পড়াশোনার খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনার জন্যও সময় বের করেছেন।

একদিকে সংসারের দায়িত্ব, অন্যদিকে সন্তানদের লালন-পালন ও পড়াশোনার দেখভাল—সবকিছুর পাশাপাশি নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে যান তিনি। চলতি বছরের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সেই পরিশ্রমের সাফল্য পেয়েছেন সাদিয়া বেগম।

রাজপাড়া আদর্শ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। অন্যদিকে, তার ছেলে তানভীর আহমেদ রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে।

সোমবার এসএসসি ফল প্রকাশের পর থেকেই স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা তাদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন। মা-ছেলেসহ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আনন্দের বন্যা।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, সাদিয়া বেগমের স্বামী তোফাজ্জল হোসেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। স্বামী-সংসার, সন্তান লালন-পালনসহ নানা দায়িত্বের মধ্যেও নিজের পড়াশোনার স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে দেননি সাদিয়া।

নিজের সাফল্যের অনুভূতি জানিয়ে সাদিয়া বেগম বলেন, পড়াশোনার প্রতি আমার ঝোঁক ছিল। কিন্তু বিয়ের পর নানা কারণে পড়ালেখা করতে পারিনি। তবে কখনো হাল ছাড়িনি। বছর দুয়েক আগে সিদ্ধান্ত নিলাম, ছেলের সঙ্গে আমিও পরীক্ষা দেব। পরিবারের সম্মতিতে এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

নিজের সাফল্যের পাশাপাশি ছেলের ফলাফলও তাকে দারুণ আনন্দিত করেছে উল্লেখ করে সাদিয়া বলেন, সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো, সংসার সামলিয়ে এবং দুই ছেলের পড়ালেখার খোঁজখবর রাখার পাশাপাশি নিজেও পড়ালেখা করে জিপিএ-৫ পেয়েছি। ছেলেও গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। মা-ছেলের এমন সাফল্যে আমরা পুরো পরিবার আনন্দিত।

মায়ের সঙ্গে একই পরীক্ষায় অংশ নেয়ার অভিজ্ঞতা তানভীর আহমেদের কাছেও ছিল অন্যরকম। তানভীর বলেন, আমি সবচেয়ে সৌভাগ্যবান যে, এবার আমার মায়ের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুজনই জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছি। কারণ মায়ের সঙ্গে পরীক্ষা দেওয়ার সৌভাগ্য কজনের হয়? আমি সেই সৌভাগ্যবান।

মায়ের পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনার কথাও তুলে ধরে তানভীর বলেন, মা সবসময় আমার পড়ালেখার খোঁজখবর রাখতেন। পাশাপাশি নিজেও পড়তেন। রাত জেগে আমার পাশে বসে থাকতেন, আর আমি পড়ালেখা করতাম। আমার এই কৃতিত্ব আমার বাবা-মাকে উৎসর্গ করছি। বড় হয়ে আমি একজন ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই। এজন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই।

মা-ছেলের এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি খুশি তাঁদের গৃহশিক্ষক আরিফুল ইসলাম। দীর্ঘদিন ধরে কাছ থেকে তাদের পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।

আরিফুল ইসলাম বলেন, আমি চার বছর ধরে তানভীরকে ইংরেজি পড়াই। পাশাপাশি তার মাকেও পড়াশোনায় সহযোগিতা করছিলাম। মা-ছেলে দুজনের এমন সাফল্যে আমি অনেক খুশি। নিজে এমন একটি ঘটনার সাক্ষী হতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি।

হুমায়রা সিদ্দিকা/এএস

শেয়ার করুন

এখনই

আরো পড়ুন