সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৬ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১০ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

চিকিৎসক লাঞ্ছিত ও ক্লিনিক ভাংচুর/জেলাজুড়ে সকাল থেকে ৪৮ ঘণ্টা বেসরকারি চিকিৎসা সেবা বন্ধ

চিকিৎসক লাঞ্ছিত ও ক্লিনিক ভাংচুর/জেলাজুড়ে সকাল থেকে ৪৮ ঘণ্টা বেসরকারি চিকিৎসা সেবা বন্ধ

চুয়াডাঙ্গা শহরের উপশম নার্সিং হোম ক্লিনিকে পিত্তথলিতে অস্ত্রোপচারের সময় রবগুল মোল্লা (৪৮) নামে এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভাঙচুর ও চিকিৎসক লাঞ্ছনার ঘটনার প্রতিবাদে চুয়াডাঙ্গা জেলাজুড়ে সরকারি- বেসরকারি চিকিৎসকরা ৪৮ ঘণ্টা সব ধরনের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) চুয়াডাঙ্গা শাখার আয়োজনে জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল ৬টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা জেলার সকল সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসক প্রাইভেট প্র্যাকটিস থেকে বিরত থাকবেন। তবে সাধারণ মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবার কথা বিবেচনায় সরকারি হাসপাতালগুলোর স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা কার্যক্রম যথারীতি চালু থাকবে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএমএ’র দপ্তর সম্পাদক ডা. মো. মোহাইমিনুল ইসলাম জানান, রোববার রাতে দীর্ঘ আলোচনার পর এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত উপশম নার্সিং হোমের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেন, ঘটনার তদন্তে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ক্লিনিকের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পেলেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রবগুল মোল্লার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর উপশম নার্সিং হোম ক্লিনিক এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ স্বজনরা প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় ক্লিনিকে ভাঙচুর করেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসা চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএমএর আহ্বায়ক ডা. মো. আবু হাসানুজ্জামান নূপুরের ওপর অতর্কিত হামলা ও মারধরের ঘটনাও ঘটে।

ওই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান নেন।

নিহত রবগুল মোল্লা (৪৫) চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার সুবদিয়া গ্রামের খেজমত মোল্লার ছেলে। পেশায় কৃষক রবগুল স্থানীয় একটি ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি।

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, পিত্তথলিতে পাথরের অস্ত্রোপচারের জন্য শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টার দিকে রবগুল মোল্লাকে উপশম নার্সিং হোম ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। পরদিন শনিবার বিকেল ৩টার দিকে তাকে অস্ত্রোপচার করেন ক্লিনিকের মালিক ও চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সার্জারি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এহসানুল হক তন্ময়। অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক হিসেবে সেখানে ছিলেন চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. রাইসুল ইসলাম জুয়েল।

নিহতের বোন সাকিনা খাতুনের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের আগে তার ভাইকে অন্তত ১০ বার ইনজেকশন দিয়ে অবশ করার চেষ্টা করা হয়। পরে অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকদের আচরণ তাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়নি। একপর্যায়ে চিকিৎসকরা রক্তের ব্যবস্থা করতে বলেন এবং রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে বলেও জানান।

তিনি বলেন, রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হলে দ্রুত জানাতে তারা চিকিৎসকদের অনুরোধ করেছিলেন। সে ক্ষেত্রে তারা রবগুল মোল্লাকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। আমার ভাই হাসতে হাসতে অপারেশনের রুমে গেলো, একদম সুস্থ-সবল মানুষ। অপচিকিৎসায় আমার ভাইটাকে তারা মেরে ফেললো। আমি তাদের বিচার চাই।

স্বজনদের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের একপর্যায়ে অপারেশন টেবিলেই রবগুল মোল্লার মৃত্যু হয়। তাদের আরও দাবি, মৃত্যুর পর চিকিৎসক ও অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক তাকে অপারেশন থিয়েটারে রেখেই সেখান থেকে চলে যান। চিকিৎসায় অবহেলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

ঘটনার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক শরিফুজ্জামান শরীফ। তিনি পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

রবগুল মোল্লার দাফন গতকাল রোববার সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। তাদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে রবগুল মোল্লার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে হবে এবং চিকিৎসায় অবহেলার সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
অন্যদিকে, উপশম নার্সিং হোমে রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসকদের ওপর হামলা ও ক্লিনিকে ভাঙচুরের প্রতিবাদে জরুরি সভা করে চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএমএ। সভায় চারটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রথম সিদ্ধান্তে নিহত রোগীর আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়।

দ্বিতীয় সিদ্ধান্তে জেলা বিএমএর আহ্বায়ক ডা. আবু হাসানুজ্জামান নূপুরকে শারীরিকভাবে নির্যাতনকারী এবং ক্লিনিকে ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত সকলকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।

তৃতীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার প্রতিবাদে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা চুয়াডাঙ্গা জেলার সকল সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসক সব ধরনের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ রাখবেন। তবে সরকারি হাসপাতালগুলোর স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা কার্যক্রম যথারীতি অব্যাহত থাকবে।

আর চতুর্থ সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, নির্ধারিত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসকদের যৌক্তিক দাবি মানা না হলে জেলা বিএমএ পরবর্তী আলোচনা সভার মাধ্যমে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবে। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসাব্যবস্থায় সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষ্যে জেলা বিএমএ সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেছে।

এদিকে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন।

এমভি/এএস

শেয়ার করুন

এখনই

আরো পড়ুন